নানা সময় ইতিহাস বিকৃতি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, রাজনৈতিক বিতর্ক বা অশ্লীলতা- এমনসব অভিযোগে বাংলাদেশে কর্তৃপক্ষ কোনও কোনও বইকে নিষিদ্ধ বা মুদ্রণ, প্রকাশনা, বিতরণ ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। কোনোটি আবার প্রকাশের পর করা হয়েছিল বাজেয়াপ্ত।
এসব বইয়ের মধ্যে ফিকশন, নন-ফিকশন - উভয় ধরনের বইই রয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা তার এক প্রতিবেদনে।
সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি কিংবা প্রকাশকদের কাছ থেকে নিষিদ্ধ এবং বাজেয়াপ্ত এসব বইয়ের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে একক কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি।
তবে প্রকাশনা খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ বইয়ের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম।
এর মধ্যে একাধিক বই নিষিদ্ধ হওয়ার পর মামলা করে আদালতের রায়ে পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনাও আছে।
অবিভক্ত ভারতে একসময় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কয়েকটি বই নিষিদ্ধ হয়েছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বই নিষিদ্ধ হয় নব্বইয়ের দশকে। তবে, স্বাধীনতার কয়েক বছর পর কবিতা লিখে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়ে এক পর্যায়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন কবি দাউদ হায়দার। সেসময় দাউদ হায়দারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে একটি মামলাও হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের লেখা ‘নারী’ বইটি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে যেসব বই নিষিদ্ধ হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম আলোচিত নন-ফিকশন বই।
১৯৯২ সালে একুশে বইমেলায় প্রথম প্রকাশিত হয় বইটি। নারীবাদ নিয়ে লেখা ৪০৮ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর পরই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ইসলাম ধর্ম এবং ধর্মবিদ্বেষী বলে অভিযোগ করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের একজন কর্মকর্তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বইটি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করার জন্য আবেদন করেন। এরপর ১৯৯৫ সালের ১৯শে নভেম্বর তৎকালীন সরকার বইটি নিষিদ্ধ করে।
সাড়ে চার বছরের আইনি লড়াই শেষে ২০০০ সালের সাতই মার্চ বইটির ওপর নিষেধাজ্ঞার আদেশ অবৈধ বলে রায় দেয় আদালত।
বিশেষ করে তার 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' উপন্যাস প্রকাশের পর ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন তার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলো।
দুই হাজার চার সালের ফেব্রুয়ারিতে একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে তাকে কুপিয়ে জখম করেছিলো একদল সন্ত্রাসী।
এরপর চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর ওই বছরেই অগাস্টে তিনি বৃত্তি নিয়ে গবেষণার জন্য গিয়েছিলেন জার্মানিতে। সেখানেই কয়েকদিন পর তার মৃত্যু হয়েছিল।
ভারতে বসবাসরত বাংলাদেশি নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিনের বেশ কয়েকটি বই নিষিদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশে।
তার লেখা 'লজ্জা' উপন্যাসটি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়, এবং প্রকাশনার ছয় মাসের মাথায় বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই বইটিকেই বাংলাদেশে প্রথম নিষিদ্ধ বই হিসেবে দাবি করা হয়।
উপন্যাসটি ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছিলো।
১৯৯৩ সালের ১১ই জুলাই এক সরকারি তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, “জনমনে বিভ্রান্তি ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিঘ্ন ঘটানো এবং রাষ্ট্রবিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রকাশের জন্য নিষিদ্ধ করা হলো তসলিমা নাসরিনের লজ্জা উপন্যাসটি।”
নিষিদ্ধ হওয়ার আগে বইটি প্রায় ৫০ হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন প্রকাশনা শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সেসময় পেশায় চিকিৎসক এই লেখকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ইসলামপন্থী বেশ কয়েকটি দল তার তীব্র সমালোচনা করে রাজপথে মিটিং-মিছিল করে লেখকের ফাঁসি দাবি করে।
এক পর্যায়ে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
ভারতেও তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছিল, বিশেষ করে যখন থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করতে শুরু করেন।
বাংলাদেশের বাইরে ভারতের কয়েকটি রাজ্য, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং ভুটানেও পরবর্তীতে বইটি নিষিদ্ধ হয়।
তসলিমা নাসরিনের লেখা আরেকটি বই 'ক' ২০০৩ সালে প্রকাশিত এবং নিষিদ্ধ হয়। লেখক বইটিকে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস বলে দাবী করেছেন।
বইয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে তার নিজের ওপর ঘটা যৌন নিপীড়নের কথা তুলে ধরেছেন। এতে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন পরিচিত লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
তবে, অভিযুক্তরা সবাই যৌন নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তাদের মধ্যে একজন তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার একটি মানহানির মামলা করেছিলেন, এবং মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বই বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত। পরে ২০১৫ সালে সে মামলাটি আদালত খারিজ করে দেয়।
সে সময় কলকাতায় বইটি ‘দ্বিখণ্ডিত’ নামে প্রকাশিত হয়। সেখানেও আদালতের আদেশে প্রাথমিকভাবে তা নিষিদ্ধ ছিল। পরে সেটি বাজারে ছাড়ার অনুমতি দেয়া হয়।
বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালের মার্চে মতিয়ুর রহমান রেনটুর লেখা ‘আমার ফাঁসি চাই’ নামক একটি বই প্রকাশিত হয় এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সরকার বইটি নিষিদ্ধ করে। বইয়েে মাধ্যমে লেখক ইতিহাস বিকৃতি এবং রাজনৈতিক বিতর্ক ছড়িয়েছেন এমন অভিযোগে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়।
এরপর ২০২০ সালে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের লেখা ‘রেভোলিউশন, মিলিটারি পারসোনেল অ্যান্ড দ্য ওয়ার অব লিবারেশন ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি বই নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।
বাংলা একাডেমির দেয়া তালিকায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালে চারটি বই মেলা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে, এসব বই আসলে নিষিদ্ধ নয়, শুধুমাত্র মেলা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিলো। ওই বইগুলো এখনো অনলাইন বাজারে কিনতে পাওয়া যাচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি
Editor PI News