ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়াবহ দমন-পীড়নের বর্ণনা দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। কঠোর দমননীতির মধ্যেও হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসছেন, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে আরোপিত ইন্টারনেট বন্ধের ফলে বিক্ষোভকারীরা কার্যত বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তবে সীমিতভাবে বাইরে আসা ভিডিওতে দেখা গেছে, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত তেহরানে হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তারা স্লোগান দেন—“খামেনির মৃত্যু চাই” এবং “শাহ দীর্ঘজীবী হোন”।

শনিবার রাতেও তেহরানের উত্তরাঞ্চলে নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এএফপি'র যাচাইকৃত এক ভিডিওতে দেখা যায়, পুনাক স্কয়ার এলাকায় আতশবাজি ফোটানো হচ্ছে, বিক্ষোভকারীরা হাঁড়ি-পাতিল বাজিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত পাহলভি শাসকদের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি কর্তৃপক্ষকে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। শুক্রবার তিনি বলেন, “ইরানি কর্তৃপক্ষ বড় বিপদে পড়বে। গুলি চালালে আমরাও গুলি চালাবো।” শনিবার রাতে তিনি আরও বলেন, “ইরান হয়তো ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত।”
এদিকে রোববার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে মার্কিন সেনা ও ইসরায়েল ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে’ পরিণত হবে। সংসদ অধিবেশনে এ সময় আইনপ্রণেতারা “আমেরিকার মৃত্যু চাই” স্লোগান দেন।
ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মাহভাদি আজাদ শনিবার বিক্ষোভে অংশ নেওয়াদের ‘ঈশ্বরের শত্রু’ হিসেবে আখ্যা দেন—যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পরে জানায়, বিক্ষোভে সহায়তাকারীরাও একই অভিযোগের মুখোমুখি হতে পারেন।
এই কঠোরতার মধ্যেও বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। সাবেক শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি জনগণকে শহর ও নগরকেন্দ্র দখলের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু রাস্তায় নামা নয়, শহরের কেন্দ্র দখল করে ধরে রাখা।” তিনি শিগগিরই ইরানে ফেরার প্রতিশ্রুতিও দেন এবং জনগণকে প্রাক-১৯৭৯ সালের ‘সিংহ ও সূর্য’ পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানান।

ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পক্ষে বিক্ষোভের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কিছু কর্মী যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছেন। তারা পুলিশের চরম সহিংসতার কথা জানিয়েছেন।
তেহরানের এক বিক্ষোভকারী জানান, “আমরা একটি বিপ্লবের জন্য দাঁড়িয়েছি, কিন্তু আমাদের সাহায্য দরকার। তাজরিশ এলাকায় স্নাইপার মোতায়েন করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে মানুষকে গুলি করা হয়েছে। আমরা শত শত লাশ দেখেছি।”
এই দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে আরেকজন মানবাধিকার কর্মী জানান, তিনি নিজ চোখে নিরাপত্তা বাহিনীকে জীবন্ত গুলি ছুঁড়তে দেখেছেন এবং নিহতের সংখ্যা ছিল “খুবই বেশি”।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১১৬ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ আটক হয়েছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী শিরিন এবাদি সতর্ক করে বলেছেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার আড়ালে ‘গণহত্যা’ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। তিনি জানান, শুধু তেহরানের একটি হাসপাতালে শত শত মানুষ চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
গত ২৮ ডিসেম্বর অর্থনৈতিক সংকট থেকে এই বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমে যাওয়ায় ইরানি সরকার এখন আগের চেয়ে বেশি দুর্বল।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বিক্ষোভকে ছোট ঘটনা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এক টিভি উপস্থাপক অভিভাবকদের সন্তানদের রাস্তায় নামতে নিষেধ করে বলেন, “কিছু হলে, গুলি লাগলে অভিযোগ করবেন না।”
ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়েছে। তবে ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট ‘নাশকতাকারী’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, ইরানের ৩১টি প্রদেশেই এখন পর্যন্ত ৫৭০টির বেশি বিক্ষোভ হয়েছে। তেহরানের গাদির হাসপাতালে নিহতদের লাশ শনাক্ত করতে দেখা গেছে স্বজনদের। নিরাপত্তা বাহিনীর ঘনিষ্ঠ ফার্স নিউজ এজেন্সি আটক বিক্ষোভকারীদের তথাকথিত স্বীকারোক্তির ভিডিও প্রচার করেছে, যা ভবিষ্যতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ভিত্তি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
Editor PI News