বাবা আর ছেলে বিকেলে বসে গণিতের খাতা দেখছিল। হঠাৎ ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, “বাবা, পাই (π) আসলে কী?” বাবা হাসলেন। টেবিলের ওপর রাখা গোল প্লেটটি দেখিয়ে বললেন, “এই গোল জিনিসটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে পাই।” ছেলে অবাক হয়ে তাকাল। তখন বাবা বললেন, “অনেক অনেক বছর আগে এক মহান গণিতবিদ এই রহস্য খুঁজে বের করেছিলেন।” এভাবেই শুরু হলো পাইয়ের গল্প—একটি সংখ্যা, যা আজ বিশ্বের গণিতচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
আজ ১৪ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পাই দিবস। গণিতের বিখ্যাত ধ্রুবক পাই–এর মান প্রায় ৩.১৪ হওয়ায় মার্চের ১৪ তারিখকে এই দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়। ২০১৯ সালে ইউনেস্কো পাই দিবসকে স্বীকৃতি দিয়ে উদযাপন শুরু করে।
পাইয়ের ধারণা সবচেয়ে আগে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদ আর্কিমিডিস। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তিনি বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত বিশ্লেষণ করে দেখান যে এই অনুপাত সব বৃত্তের জন্য একই থাকে। তিনি বহুভুজের সাহায্যে বৃত্তকে ঘিরে এবং বৃত্তের ভেতরে বিভিন্ন আকারের জ্যামিতিক চিত্র বসিয়ে হিসাব করে পাইয়ের মানের কাছাকাছি একটি সীমা নির্ধারণ করেছিলেন। যদিও তার আগে ব্যাবিলন ও মিশরের গণিতবিদরাও বৃত্তের পরিমাপ নিয়ে কাজ করেছিলেন, তবে আর্কিমিডিসের পদ্ধতিই পাইকে গণিতের গুরুত্বপূর্ণ ধ্রুবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
পাইয়ের ব্যবহার আজ অসংখ্য ক্ষেত্রে বিস্তৃত। জ্যামিতিতে বৃত্তের ক্ষেত্রফল ও পরিধি নির্ণয়ে পাই অপরিহার্য। পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান, প্রকৌশল, জ্যোতির্বিজ্ঞান এমনকি আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের বিভিন্ন হিসাবেও এই সংখ্যার ব্যবহার রয়েছে। সেতু নির্মাণ, মহাকাশযানের কক্ষপথ নির্ণয় কিংবা তরঙ্গ ও বৃত্তাকার গতির বিশ্লেষণ—সব ক্ষেত্রেই পাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে গণিতের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গবেষক—সবার কাছেই এটি একটি মৌলিক ধারণা।
বিশ্বজুড়ে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজ্ঞান সংগঠনগুলো নানা আয়োজনের মাধ্যমে পাই দিবস উদযাপন করে। শিক্ষার্থীরা পাইয়ের অঙ্ক মুখস্থ বলে, গণিতভিত্তিক কুইজে অংশ নেয় এবং অনেক জায়গায় গোলাকার খাবার—বিশেষ করে পাই বা কেক—কেটে উদযাপন করা হয়।
সরলভাবে বললে, পাই হলো একটি বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত। অর্থাৎ যেকোনো বৃত্তের পরিধিকে তার ব্যাস দিয়ে ভাগ করলে যে সংখ্যা পাওয়া যায়, সেটিই পাই। এই সংখ্যার মান প্রায় ৩.১৪ হলেও এটি আসলে একটি অসীম দশমিক সংখ্যা, যার শেষ নেই। তবুও হাজার বছর ধরে গণিতের জগতে এই রহস্যময় সংখ্যাই বৃত্তের প্রকৃতিকে বোঝার অন্যতম চাবিকাঠি হয়ে আছে।
শেষে বাবা ছেলেকে বললেন, ধরো—“তোমার সামনে যে গোল প্লেটটা আছে, তার এক পাশ থেকে আরেক পাশ পর্যন্ত সোজা দূরত্বটা হলো ব্যাস। ধরো সেই ব্যাসের দৈর্ঘ্য ১০ সেন্টিমিটার। এখন আমরা জানি, বৃত্তের পরিধি বের করার সূত্র হলো—পরিধি = π × ব্যাস।”
এখানে π বা পাইয়ের মান ধরা হয় প্রায় ৩.১৪। তাহলে অংকটা হবে—
পরিধি = ৩.১৪ × ১০
পরিধি = ৩১.৪ সেন্টিমিটার।
অর্থাৎ ১০ সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি গোল প্লেটের চারপাশ ঘুরে মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৩১.৪ সেন্টিমিটার। বাবা তখন ছেলেকে বলে, “দেখো, পৃথিবীর সব বৃত্তের ক্ষেত্রেই এই পাই কাজ করে। তাই গণিতে পাই এত গুরুত্বপূর্ণ।”
Editor PI News