বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত নাম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। একজন সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। রণাঙ্গনের সাহসী যোদ্ধা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ পর্যন্ত তাঁর যাত্রা আজও রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক আলোচনার অন্যতম বিষয়।
বাংলার আকাশে যখন দুঃসময়ের কালো মেঘ জমেছিল, মানুষের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং বাঙালির আত্মপরিচয়কে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছিল তখন ইতিহাসের মঞ্চে আবির্ভূত হন এক দৃঢ়চেতা সেনা কর্মকর্তা।
সময়ের আবর্তনে সেই মানুষটিই হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তার জীবন ছিল যেন এক চলমান ইতিহাস যেখানে যুদ্ধ আছে, ত্যাগ আছে, স্বপ্ন আছে, আছে রাষ্ট্রগঠনের নিরন্তর সংগ্রাম।
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি তৎকালীন পাবনা জেলার বাগবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে বিভিন্ন শহরে। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে একজন দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
সহকর্মীদরে কাছে তিনি ছিলেন নীরব অথচ দৃঢ়চেতা একজন কর্মকর্তা। তিনি কথা বলতেন কম, অথচ দায়িত্ব পালনে ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক ও সাহসী। তাঁর সামরিক জীবনের এই শৃঙ্খলা পরবর্তীতে রাষ্ট্র পরিচালনায়ও প্রতিফলিত হয়েছিল।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙ্গালির ওপর বর্বর হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে সমগ্র জাতি স্বাধীনতার চূড়ান্ত সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই ভয়াল মুহূর্তে চট্টগ্রামের কালুঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে বাঙ্গালির মুক্তির সংগ্রামকে নতুন গতি দেন জিয়াউর রহমান।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জিয়াউর রহমান সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সে সময় তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হলেও বাঙালির স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তাঁর সাহসিকতা ও নেতৃত্বগুণের জন্য তিনি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন জিয়াউর রহমান। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের পর দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তিনি। পরবর্তীতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতীয় পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং বেসরকারি খাতের বিকাশে তিনি নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ান। তাঁর সময়েই দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা গুরুত্ব পেতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন (সার্ক) প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাজনীতিতে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগও তাঁর শাসনামলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৭৮ সালে তিনি Bangladesh Nationalist Party (BNP) প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। জাতীয়তাবাদ, আত্মনির্ভরশীলতা এবং উন্নয়নকে কেন্দ্র করে তিনি একটি রাজনৈতিক দর্শন গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন, উন্নয়ন কেবল শহরের অট্টালিকায় সীমাবদ্ধ থাকলে একটি রাষ্ট্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাই তিনি গ্রামীণ জনপদের উন্নয়ন, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং উৎপাদনমুখী সমাজ গঠনের ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তার শাসনামলেই বাস্তবায়িত হয়। একইসঙ্গে মাদরাসা শিক্ষায় বিজ্ঞান ও আধুনিক বিষয় অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াও তার সময় গুরুত্ব পেতে শুরু করে। তিনি বিশ্বাস করতেন ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় একটি জাতিকে নৈতিক ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
রাজনৈতিক জীবনের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনেও জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত সংযমী ও সাদাসিধে। প্রচারের চেয়ে তিনি কাজকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তার জীবনযাপন ছিল সাধারণ, কিন্তু চিন্তাধারা ছিল সুদূরপ্রসারী।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাই কেবল একজন ব্যক্তি নন তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়, স্বাধীনতার সাহসী উচ্চারণ, রাষ্ট্রগঠনের এক নিরলস যাত্রা এবং এক কর্মময় জীবনের অনিঃশেষ মহাকাব্য।
Editor PI News