আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে সমালোচিত বিধানটি প্রত্যাহারের জন্য অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি নিবন্ধনে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার কমানো এবং বিভিন্ন শিল্পখাতে কর-শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব দেন তিনি।
সোমবার জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম কার্যদিবসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন।
সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে উন্নয়ন হবে ন্যায়ভিত্তিক, অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, রাষ্ট্র হবে জবাবদিহিমূলক এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবন হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তব্যের শেষে তিনি বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় স্পিকারকে ধন্যবাদ জানান এবং জাতীয় সংসদের সব সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দেশের কল্যাণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের মতামত ও বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় প্রস্তাবিত বাজেটের সেই বিধানটি অনেকেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। জনগণের মতামতের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে বিতর্কিত বিধানটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
ব্যক্তি করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানোর সুপারিশ করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা উচিত।
উচ্চশিক্ষা খাতে সহায়তা বাড়ানোর লক্ষ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এর বিপরীতে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার, ভাষা শিক্ষা ল্যাব স্থাপন এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ব্যাংক হিসাব খোলা, সম্পত্তি নিবন্ধন এবং মিউটেশনের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব নিয়েও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে এসব বিধান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগোষ্ঠীর জন্য করসুবিধা সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের ব্যবসা, কৃষি ও বেতনভিত্তিক আয়ও করমুক্ত করা উচিত।
রফতানিমুখী চিংড়ি শিল্পের বিকাশে অ্যাকুয়া ফিড, ফিড অ্যাডিটিভ, ভিটামিন, প্রোবায়োটিকসসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনশীল শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে আরও রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
মধু, পিভিসি ও পিইটি রেজিন, কোল্ড রোলড শিট, রিফাইন্ড কপার, অপরিশোধিত কাজুবাদামসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের ওপর আরোপিত শুল্ক ও কর কমানোরও প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেটে ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সার তহবিল গঠনকে যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এই তহবিল নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন ও অনলাইন বিজ্ঞাপনের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, উচ্চ ভ্যাটের কারণে অনেক ব্যবসায়ী আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে লেনদেন করছেন, যা রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের জন্য অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের জন্য অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেন তিনি।
জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে উন্নত সেবা দিতে প্রশাসনে জবাবদিহি, উপযুক্ত বেতন কাঠামো, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, জনগণের কষ্ট লাঘব, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রশ্নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশে যেন আর কখনও ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং বাংলাদেশকে যেন কোনো তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করা না যায়, সেটিই হওয়া উচিত সবার সম্মিলিত অঙ্গীকার।
Editor PI News