প্যারাগুয়ের রাজধানী আসুনসিওনে প্রায় আট বছর ধরে বসবাস করছেন বাংলাদেশি দম্পতি মিতু ও অপু। স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যেতে যেতে দেশটির অনেক ঐতিহ্যবাহী খাবারই এখন তাদের নিত্যদিনের রান্নাঘরের অংশ।
গত সপ্তাহে তাদের বাসায় ছিল কাজিনদের ছোট্ট একটি পারিবারিক আড্ডা। টেবিলে ছিল বারবিকিউ, সালাদ, গ্রিলড মাংস আর নানা রকম খাবার। কিন্তু সবার চোখ আটকে গেল ধোঁয়া ওঠা এক বড় পাত্রের স্যুপে।
প্রথম চামচ মুখে দিয়েই একজন বলে উঠলেন, “এটা তো দারুণ! কী দিয়ে বানিয়েছ?” আরেকজন যোগ করলেন, "রেসিপিটা কিন্তু আজ না বললে আপনাকে ছাড়ছি না।"

হেসে মিতু উত্তর দিলেন, “এটার নাম ভোরি ভোরি। প্যারাগুয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর একটি।” এরপর শুরু হলো তার রেসিপির গল্প।
“প্রথমে মুরগি, পেঁয়াজ, রসুন, গাজর, টমেটো, সেলারি আর কয়েকটি সুগন্ধি মসলা দিয়ে ধীরে ধীরে একটি সমৃদ্ধ স্টক তৈরি করতে হয়। এরপর কর্নমিলের সঙ্গে চিজ কুঁচি, একটি ডিম, সামান্য মাখন আর অল্প দুধ মিশিয়ে নরম খামির বানানো হয়। সেই খামির থেকে ছোট ছোট বল তৈরি করে ফুটন্ত স্টকে ছেড়ে দিতে হয়। ধীরে ধীরে বলগুলো ফুলে ওঠে, ঝোলের স্বাদ নিজের মধ্যে টেনে নেয়। শেষে ধনেপাতা বা পার্সলে ছড়িয়ে গরম গরম পরিবেশন করলেই তৈরি হয়ে যায় ভোরি ভোরি।”
রেসিপি শোনার পর একজন মজা করে বললেন, “এটা তো শুধু স্যুপ নয়, পুরো একটা অনুভূতি!”
হয়তো সে কারণেই শত বছরের ঐতিহ্য বহন করা এই সাধারণ খাবারটিই এবার বিশ্বজুড়ে আলোচনায়। জনপ্রিয় খাদ্যবিষয়ক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম TasteAtlas–এর সর্বশেষ র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের সেরা খাবারের স্বীকৃতি পেয়েছে প্যারাগুয়ের ভোরি ভোরি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় সাড়ে চার লাখের বেশি ব্যবহারকারীর রেটিং বিশ্লেষণ করে তৈরি করা তালিকায় ভোরি ভোরি পেয়েছে সর্বোচ্চ ৪.৬৪ নম্বর। এর নিচে রয়েছে ইতালির বিশ্বখ্যাত Pizza Napoletana এবং ট্রাফল পাস্তা Tajarin al Tartufo Bianco d'Alba।
ভোরি ভোরির সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি। কয়েক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক খাদ্যবিশ্বে আলোচনায় রয়েছে এই খাবার।

২০২৩ সালে এটি বিশ্বের সেরা স্যুপ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরের বছরও সেই অবস্থান ধরে রাখে। আর এবার সব ধরনের খাবারকে পেছনে ফেলে বিশ্বের এক নম্বর খাবারের আসনে উঠে এসেছে।
ভোরি ভোরির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ছোট ছোট গোল বল। কর্নমিল ও স্থানীয় চিজ দিয়ে তৈরি এই বলগুলো মুরগি বা গরুর মাংসের সুগন্ধি ঝোলে রান্না করা হয়। রান্নার সময় বলগুলো ঝোলের স্বাদ শুষে নেয়, কিন্তু গলে যায় না। ফলে স্যুপটি একদিকে যেমন ঘন হয়, অন্যদিকে প্রতিটি চামচে পাওয়া যায় নরম ও চিজের স্বাদে ভরপুর ছোট ছোট বল।
শীতের দিনে এটি প্যারাগুয়ের ঘরে ঘরে সবচেয়ে প্রিয় খাবারগুলোর একটি হলেও বছরের প্রায় সব সময়ই এটি খাওয়া হয়।
ভোরি ভোরির শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় প্যারাগুয়ের আদিবাসী গুয়ারানি জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতিতে। শত শত বছর আগে কর্নভিত্তিক খাবার ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সীমিত উপকরণ দিয়ে পুষ্টিকর খাবার তৈরির সেই ঐতিহ্য থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় ভোরি ভোরি।
'ভোরি' শব্দটির অর্থ গুয়ারানি ভাষায় ছোট গোল বল। শব্দটি দুবার উচ্চারণ করে 'ভোরি ভোরি' বলার মাধ্যমে বোঝানো হয়—অনেকগুলো ছোট বল দিয়ে তৈরি খাবার।
২০১৭ সালে প্যারাগুয়ে সরকার ভোরি ভোরিকে দেশের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। শুধু রেসিপি নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রান্নার কৌশল ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যেই এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এমনকি রাজধানী আসুনসিওনে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল 'ভোরি ভোরি দিবস'ও পালন করা হয়।
ভোরি ভোরির জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্যারাগুয়ের খাদ্যসংস্কৃতির পরিচিতিও। দেশটির ঐতিহ্যবাহী চিজ ব্রেড চিপা ইতোমধ্যেই বিশ্বের সেরা রুটির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। লন্ডন ও নিউইয়র্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্যারাগুয়ের রেস্তোরাঁ স্থানীয় খাবারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তুলছে।
খাদ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, ভোরি ভোরির সবচেয়ে বড় শক্তি এর সরলতা। কোনো আধুনিক রূপান্তর বা বিলাসী উপস্থাপন নয়, বরং শত বছরের ঐতিহ্য, স্থানীয় উপকরণ এবং ঘরোয়া স্বাদের কারণেই এটি বিশ্বের মানুষের মন জয় করেছে।
বিশ্বের সেরা খাবারের স্বীকৃতি তাই শুধু একটি স্যুপের অর্জন নয়; এটি প্যারাগুয়ের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মানুষের জীবনযাত্রারও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এখন বিশ্বের নানা প্রান্তের ভ্রমণপিপাসু ও খাদ্যরসিকদের নতুন গন্তব্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছে একটি নাম—ভোরি ভোরি।
Editor PI News