বাংলাদেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী আতিয়া ইসলাম আর নেই। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শেষে তিনি মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সমাজে নারীর অবস্থান, বৈষম্য, সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়কে শক্তিশালী শিল্পভাষায় ক্যানভাসে তুলে ধরে তিনি দেশের শিল্পাঙ্গনে স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন।
বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আতিয়া ইসলাম। তাঁর স্বামী শিল্পী হাসান মাহমুদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আজই রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
আতিয়া ইসলাম মূলত বাস্তবধর্মী চিত্রকলার শিল্পী ছিলেন। তাঁর শিল্পকর্মে বারবার উঠে এসেছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য, পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য, সহিংসতা, সামাজিক অসংগতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক-সামাজিক সংকটের চিত্র। নারীবাদী আন্দোলন ও প্রতিবাদের গল্পকে তিনি রঙ ও রেখার শক্তিশালী ভাষায় ফুটিয়ে তুলতেন। এ কারণেই তিনি দেশের শিল্পাঙ্গনে একজন নারীবাদী শিল্পী হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।
উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার, রূপকধর্মী উপস্থাপনা, ব্যঙ্গ ও প্রতীকনির্ভর শিল্পভাষা ছিল তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নব্বইয়ের দশকে দেশের নারী শিল্পীদের মধ্যে বক্তব্যের স্পষ্টতা ও উপস্থাপনার স্বাতন্ত্র্যের জন্য তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত হন এবং নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন।
১৯৬২ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন আতিয়া ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ১৯৮২ সালে অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগে বিএফএ এবং ১৯৮৫ সালে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮১-৮২ শিক্ষাবর্ষে চারুকলার ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
পেশাগত জীবনে তিনি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল সানবিমসে চিত্রাঙ্কনের শিক্ষক ছিলেন। পাশাপাশি ধানমন্ডিতে ‘ঝাপি স্কুল অব আর্ট’ নামে শিশুদের চিত্রাঙ্কন শেখানোর একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
দেশ-বিদেশে তাঁর শিল্পকর্ম ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। গ্যালারি ২১, বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস এবং আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে তাঁর একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ১৯৮১ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, মিয়ানমার ও বাংলাদেশে ৬০টির বেশি দলীয় প্রদর্শনীতে তাঁর চিত্রকর্ম স্থান পায়।
তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনীর বিষয় ছিল ‘নারী ও সমাজ’। দ্বিতীয় একক প্রদর্শনীতে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট এবং তৃতীয় প্রদর্শনীতে জীবনযাপন, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে উপজীব্য করে আঁকা চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়।
১৯৭৬ সালে জুনিয়র রেডক্রস জাতীয় চিত্র প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে তাঁর পুরস্কারজয়ের সূচনা। পরে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজিত ১৮তম এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল বাংলাদেশ-এ তিনি প্রধান পুরস্কার লাভ করেন।
ব্যক্তিজীবনে আতিয়া ইসলামের বাবা আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং মা আয়শা ইসলাম—দুজনেই প্রয়াত। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর স্বামী শিল্পী হাসান মাহমুদ। তাঁদের দুই মেয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্রান্সপ্রবাসী চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের শ্যালিকা ছিলেন আতিয়া ইসলাম। তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
Editor PI News