ঢাকার ইতিহাস শুধু মসজিদ, দুর্গ, নবাববাড়ি কিংবা বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে নয়; এই শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘদিন উপেক্ষিত অধ্যায় হলো বাইজি বা তাওয়াইফ সংস্কৃতি। একসময় ঢাকার রাজদরবার, জমিদারবাড়ি, নবাব প্রাসাদ, রঙমহল এবং অভিজাত সমাজের বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তাঁরা। তাঁরা ছিলেন সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, কবি, সংস্কৃতিবান নারী এবং সামাজিক আচার-ব্যবহারে প্রশিক্ষিত এক বিশেষ শ্রেণি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক পালাবদলে তাঁদের ইতিহাস ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়।
ঢাকায় বাইজি সংস্কৃতির গোড়াপত্তন হয় মুঘল আমলে। সুবাহদার ইসলাম খান ঢাকায় রাজধানী প্রতিষ্ঠার পর রাজদরবারে নাচ ও গানের প্রচলন করেন। ইতিহাসবিদ সৈয়দ মুহাম্মদ তাইফুরের বর্ণনা অনুযায়ী, ইসলাম খানের দরবারে লুলি, কাঞ্চনি, হরকানি ও ডোমনি নামে পরিচিত অসংখ্য নৃত্যশিল্পী নিয়োজিত ছিলেন। তাঁদের পেছনে মাসে প্রায় ৮০ হাজার রুপি ব্যয় হতো।
মজার বিষয় হলো, ইসলাম খান নিজে এসব পরিবেশনা খুব একটা উপভোগ করতেন না। জনশ্রুতি রয়েছে, তিনি বিশ্বাস করতেন—রাতভর নাচ-গানের আসরে শহরের বখাটে, চোর ও দুর্বৃত্তরা ব্যস্ত থাকলে অপরাধ কমে যাবে। ফলে এই সাংস্কৃতিক আয়োজনকে তিনি এক ধরনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করতেন।
পরবর্তী সময়ে মুঘল দরবারের সেই নৃত্যশিল্পীদের উত্তরসূরিরাই বাইজি নামে পরিচিত হন। নবাব, জমিদার এবং ধনী ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁদের শিল্পচর্চা আরও বিকশিত হয়। ঢাকার শাহবাগ, রঙমহল, বাগানবাড়ি, ব্যক্তিগত মেহফিল এবং এমনকি বুড়িগঙ্গার ওপর ভাসমান বিলাসবহুল নৌকাতেও তাঁদের পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হতো।

নবাব আবদুল গণি ও নবাব আহসানউল্লাহর সময় বাইজি সংস্কৃতি সর্বোচ্চ বিকাশ লাভ করে। কলকাতা ও উত্তর ভারত থেকে বহু খ্যাতিমান শিল্পী ঢাকায় আসেন। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্পীরাও এই পেশায় যুক্ত হন। ফলে জিন্দাবাহার, বাদামতলী, কাঁদুপট্টি, সাঁচিবন্দরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে বাইজি বাড়ি ও বাইজি পল্লি।
সব বাইজি যৌনপেশায় যুক্ত ছিলেন—এমন ধারণা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। বাইজিদের মধ্যেও বিভিন্ন শ্রেণি ছিল।
যাঁদের নামের শেষে 'বাই' যুক্ত থাকত, তাঁরা মূলত কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। 'জান' উপাধিধারীরা গান ও নাচ—দুটোই পরিবেশন করতেন। 'কানিজ' অতিথিদের আপ্যায়নের দায়িত্ব পালন করতেন। আর 'খানাগি' শ্রেণির নারীরা যৌনপেশায় যুক্ত ছিলেন।

'তাওয়াইফ' শব্দটিও অনেক ক্ষেত্রে 'বাইজি'র সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
বাইজিরা শুধু নৃত্যশিল্পী ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের গুরুত্বপূর্ণ ধারক। খেয়াল, ঠুমরি, টপ্পা, গজল, দাদরা ও ভজন তাঁদের পরিবেশনার প্রধান অংশ ছিল।
একটি মুজরা ছিল নিখুঁত পরিকল্পনার শিল্পানুষ্ঠান। সারেঙ্গি, তবলা, ঝাঁঝরি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের তালে তাঁরা চোখ, মুখ, হাত ও শরীরের সূক্ষ্ম অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে গানের আবেগ ফুটিয়ে তুলতেন। তাঁদের পোশাকে থাকত পেশওয়াজ, চুড়িদার, ওড়না এবং পায়ে ঘুঙুর।

তাঁদের সঙ্গে সফরদার নামে পরিচিত সহকারীরা থাকতেন, যাঁরা বাদ্যযন্ত্র বাজানো, অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজ করতেন।
ঐতিহাসিকদের মতে, খেমটা নাচ ও বাইজি নাচ এক নয়। বাইজি নৃত্য ছিল শাস্ত্রীয় ধারার, সংযত ও নান্দনিক। অন্যদিকে খেমটা ছিল লোকজ, প্রাণবন্ত এবং জনবিনোদনকেন্দ্রিক। অনেক খেমটা শিল্পী পরবর্তীকালে দক্ষতা অর্জন করে বাইজি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
নবাব আবদুল গণির সময় শাহবাগে প্রতি বছর জাঁকজমকপূর্ণ সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন হতো। নবাব এস্টেটের অধীনে বহু বাইজি নিয়মিত বেতনভুক্ত শিল্পী হিসেবে কাজ করতেন।
নওয়াবিন, অন্নু ও গন্নুর মতো শিল্পীরা সে সময় ঢাকার সাংস্কৃতিক জীবনের উজ্জ্বল নাম ছিলেন। তাঁদের মাধ্যমে সংগীতচর্চা অভিজাত সমাজে নতুন মাত্রা পায়।
বাইজিদের শুধু গান-নাচ নয়, সামাজিক আচরণ, অতিথি আপ্যায়ন, কথাবার্তা, হাসি, চলাফেরা—সবকিছুতেই বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। কারণ তাঁদের দর্শক ছিলেন সমাজের প্রভাবশালী ও শিক্ষিত শ্রেণি।
ঢাকার মেহফিলে যাঁদের উপস্থিতি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম গওহর জান। ১৮৯৬ সালে তিনি ঢাকার একটি অভিজাত বিয়ের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন।

গওহর জান শুধু অসাধারণ শিল্পীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন ভারতীয় সংগীত ইতিহাসের অন্যতম আধুনিক ব্যক্তিত্ব। ১৯০২ সালে তিনি গ্রামোফোনে গান রেকর্ড করা প্রথমদিকের ভারতীয় শিল্পীদের একজন। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ফারসি, মারাঠি, পাঞ্জাবি ও ইংরেজিসহ বহু ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি।
প্রতিটি রেকর্ডিংয়ের শেষে তাঁর বিখ্যাত ঘোষণা—"মাই নেম ইজ গওহর জান"—আজও সংগীত ইতিহাসের অংশ।
জিন্দাবাহার এলাকার কিংবদন্তি শিল্পী হরিমতী বাইজি তাঁর ভৈরবী রাগের ঠুমরির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। সমসাময়িক লেখকদের বর্ণনায় দেখা যায়, তাঁর কণ্ঠের সুর জিন্দাবাহার ছাড়িয়ে ইসলামপুর পর্যন্ত ভেসে যেত। সেই সুরে মুগ্ধ হয়ে পথচারীরাও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়তেন।
ব্রিটিশ আমলে জিন্দাবাহারের গঙ্গাজলি ছিল ঢাকার অন্যতম বিখ্যাত বাইজি বাড়ি। সন্ধ্যা নামলেই সেখানে ঠুমরি, দাদরা ও নৃত্যের আসর বসত। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিল্পীরা এসে কয়েকদিন অবস্থান করতেন। দিনের বেলায় চলত রেওয়াজ, রাতে জমে উঠত মুজরা।
আজ সেই গঙ্গাজলির কোনো অস্তিত্ব নেই। হারিয়ে গেছে পাশের কালীমন্দিরও। কিন্তু স্মৃতিকথা ও সাহিত্যে রয়ে গেছে সেই জৌলুসের স্মৃতি।
অভিজাত সমাজে জনপ্রিয় হলেও বাইজিরা কখনো পূর্ণ সামাজিক মর্যাদা পাননি। এমনকি অনেক শাস্ত্রীয় সংগীতগুরুও তাঁদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন। তাঁদের শিল্প গ্রহণ করা হলেও ব্যক্তি হিসেবে তাঁরা অবহেলিত ছিলেন।
ঐতিহাসিকদের মতে, কৌলীন্য প্রথা, বহুবিবাহ, অল্পবয়সী মেয়েদের অনুপযুক্ত বিয়ে, স্বামী পরিত্যাগ এবং চরম দারিদ্র্য বহু নারীকে পতিতাবৃত্তির দিকে ঠেলে দেয়। ব্রিটিশ আমলে দাসপ্রথা এবং নারী কেনাবেচাও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
উনিশ শতকের ঢাকা ছিল অসংখ্য পতিতাপল্লির শহর। সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৮৩০ সালে যেখানে নিবন্ধিত পতিতার সংখ্যা ছিল ২৩৪, সেখানে ১৯০১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২,১৬৪ জনে। সমসাময়িক সংবাদপত্রে ঢাকার প্রধান সড়কের দুই পাশজুড়ে পতিতালয়ের বিস্তারের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
জিন্দাবাহার, কাঁদুপট্টি, বাদামতলী ও সাঁচিবন্দর তখন এই সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র ছিল।
বাংলা থিয়েটারে নারীদের প্রথম প্রবেশ ঘটে মূলত এই বাইজি ও পতিতালয়ের শিল্পীদের হাত ধরেই। পরবর্তীকালে বিনোদিনী, তারাসুন্দরী, অঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা ও কানন দেবীর মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেন।

ঢাকার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট কিস-এর একাধিক অভিনেত্রীরও শিকড় ছিল এই সমাজে।

সমাজ তাঁদের অবজ্ঞা করলেও মানবিকতায় তাঁরা অনেক সময় অভিজাতদেরও ছাড়িয়ে গেছেন। ১৮৭৪ সালে ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে নবাব আবদুল গণির আহ্বানে কেউ এগিয়ে না এলেও বাইজি রাজলক্ষ্মী ও আমিরজান অনুদান দেন। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত জিন্দাবাহারের কালীমন্দির পুনর্নির্মাণেও রাজলক্ষ্মীর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ব্রিটিশ শাসনের অবসান, দেশভাগ এবং জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর বাইজি সংস্কৃতির প্রধান পৃষ্ঠপোষকরা হারিয়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় মেহফিল, নীরব হয়ে পড়ে রঙমহল, থেমে যায় সারেঙ্গি, তবলা ও ঘুঙুরের শব্দ।
আজ ঢাকার সেই বাইজি সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত। রয়ে গেছে কেবল কিছু পুরোনো আলোকচিত্র, গ্রামোফোন রেকর্ড, স্মৃতিকথা, সাহিত্য এবং ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন দলিল। তবে তাঁদের উত্তরাধিকার শুধু বিনোদনের ইতিহাস নয়; এটি শাস্ত্রীয় সংগীতের বিকাশ, নগর সংস্কৃতির বিবর্তন, নারীজীবনের সংগ্রাম, সামাজিক বৈষম্য এবং শিল্পের প্রতি এক জটিল সমাজের দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গির ইতিহাসও বটে।
ঢাকার ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে হলে বাইজিদের এই বিস্মৃত জগতকেও স্মরণ করতে হবে। কারণ তাঁদের ঘুঙুরের শব্দ থেমে গেলেও, বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁদের পদচিহ্ন এখনো মুছে যায়নি।
Editor PI News