আরেকবার মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা, আরেকবার শেষ মুহূর্তের নাটক। ইংল্যান্ড যেন সংকটকে জয়ে পরিণত করার নতুন শিল্প শিখে ফেলেছে। ম্যাচের ৯০ মিনিট পেরিয়ে যখন বিদায়ের শঙ্কা ঘিরে ধরেছিল থ্রি লায়ন্সদের, তখনই জুড বেলিংহাম জ্বলে ওঠেন। যোগ করা সময়ে সমতা ফেরানোর পর অতিরিক্ত সময়ের তৃতীয় মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে নরওয়ের স্বপ্ন ভেঙে দেন তিনি। তার জোড়া গোলেই ২-১ ব্যবধানে জিতে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ইংল্যান্ড।
রোববার যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপের দ্বিতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই দল। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে ম্যাচটি ছিল ১-১ সমতায়। অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই জয়সূচক গোল করে ইংল্যান্ডকে টানা লড়াইয়ের পর শেষ চারে তোলেন বেলিংহাম। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছিল নরওয়ে, আর ২০১৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠল ইংল্যান্ড। সব মিলিয়ে এটি ইংল্যান্ডের চতুর্থ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল (১৯৬৬, ১৯৯০, ২০১৮ ও ২০২৬)।
শুরুর দিকে বলের দখল ইংল্যান্ডের থাকলেও সুযোগ কাজে লাগায় নরওয়ে। ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডের নিখুঁত পাস ধরে ইংল্যান্ডের রক্ষণ ভেদ করে জোরালো শটে গোল করেন আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ। পিছিয়ে পড়ে আক্রমণের ঝড় তোলে টমাস টুখেলের দল। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের পাস থেকে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান জুড বেলিংহাম। প্রথমার্ধে আর গোল না হলে বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। নরওয়ে আরও গোছানো ফুটবল খেলতে থাকে এবং শেষ ২০ মিনিটে ইংল্যান্ডকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখে। আর্লিং হালান্ড, আন্তোনিও নুসা ও অস্কার বব একের পর এক আক্রমণ গড়লেও শেষ মুহূর্তে ফিনিশিং ব্যর্থতায় এগিয়ে যেতে পারেনি স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা। নির্ধারিত সময়ে আর গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের তৃতীয় মিনিটেই নরওয়ের গোলরক্ষক ওরিয়ান নিল্যান্ডের ভুলের সুযোগ নিয়ে জয়সূচক গোল করেন বেলিংহাম। এরপরও হাল ছাড়েনি নরওয়ে। নুসা, সান্দার বের্গ ও অস্কার বব একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও ইংল্যান্ডের রক্ষণ ভাঙতে পারেননি। অন্যদিকে বুকায়ো সাকা ও বদলি ডিজেড স্পেন্সের পরপর কয়েকটি প্রচেষ্টা দারুণভাবে ঠেকিয়ে ম্যাচে নরওয়েকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন নিল্যান্ড। কিন্তু নিজের একটি ভুলই শেষ পর্যন্ত তার সব কৃতিত্ব ম্লান করে দেয়।
ব্যক্তিগত লড়াইটাও ছিল দারুণ উপভোগ্য। ইংল্যান্ডের হয়ে জুড বেলিংহাম ছিলেন ম্যাচের নায়ক। হ্যারি কেইন পুরো ম্যাচজুড়ে চেষ্টা করেও গোলের দেখা পাননি। অন্যদিকে নরওয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা আর্লিং হালান্ডও একাধিক সুযোগ পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত বেলিংহামের দুই গোলই দুই দলের ভাগ্য গড়ে দেয়।
পরিসংখ্যানে অবশ্য দুই দলের লড়াই ছিল প্রায় সমান। বলের দখলে ইংল্যান্ড এগিয়ে ছিল ৫৩ শতাংশ, নরওয়ের ছিল ৪৭ শতাংশ। ইংল্যান্ড মোট ৫৪৬টি পাস সম্পন্ন করে, যেখানে নরওয়ের পাস ছিল ৪৭৮টি। লক্ষ্যভেদী শটেও সামান্য এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড—৬টি, নরওয়ের ৫টি।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে হার্ড রক স্টেডিয়াম লাল-সাদা উৎসবে রূপ নেয়। গ্যালারিতে থাকা হাজারো ইংলিশ সমর্থক "It's Coming Home" ধ্বনিতে মুখর করে তোলেন পুরো স্টেডিয়াম। খেলোয়াড়দের কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন, কেউ আলিঙ্গনে উদযাপন করেন ঐতিহাসিক জয়। অন্যদিকে নরওয়ের গোলরক্ষক নিল্যান্ডকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। হালান্ড এগিয়ে গিয়ে হ্যারি কেইন ও বেলিংহামকে আলিঙ্গন করে অভিনন্দন জানান।
এবার সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপে দুই দলের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল—ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং পরে শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া একক নৈপুণ্যের সেই ম্যাচ। প্রায় চার দশক পর আবারও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই ফুটবল পরাশক্তি। ইতিহাস, প্রতিশোধ আর ফাইনালের টিকিট—সব মিলিয়ে আরেকটি ক্লাসিক লড়াইয়ের অপেক্ষায় এখন ফুটবল বিশ্ব।
Editor PI News