স্পেনের রাজত্ব, মেসির স্বপ্নভঙ্গ; ১৬ বছর পর আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লা রোজা

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে গেল বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে স্পেন। লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে নতুন ফুটবল পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার বার্তা দিল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।

পুরো ম্যাচজুড়েই আধিপত্য ছিল স্পেনের। বলের দখল, পাসিং, আক্রমণ—প্রায় সব পরিসংখ্যানেই পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। ৬৬.৩ শতাংশ বলের দখল রেখে স্পেন ১৭টি শট নেয়, যার বেশ কয়েকটি দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্টিনেজ। অন্যদিকে পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা গোলমুখে কার্যকর কোনো শটই নিতে পারেনি। প্রতিপক্ষের বক্সে স্পেন ২৩ বার প্রবেশ করলেও আর্জেন্টিনা তা পেরেছে মাত্র দুবার। ৬৪৭টি সফল পাসের বিপরীতে আর্জেন্টিনার ছিল ৩৩৭টি পাস, আর মাঝমাঠে রদ্রি ও পেদ্রিদের নিয়ন্ত্রণে কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে লিওনেল স্কালোনির দল।

ফাইনালে গোল না করলেও স্পেনের আক্রমণের প্রাণ ছিলেন লামিনে ইয়ামাল। ডান প্রান্তে তার গতি, ড্রিবলিং ও সুযোগ তৈরির ক্ষমতা বারবার চাপে ফেলেছে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে। এই টুর্নামেন্টে একাধিক গোল ও অ্যাসিস্ট করে ১৯ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম প্রধান তারকায় পরিণত হয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বাধিক গোলে সরাসরি অবদান রাখা কিশোর ফুটবলারদের তালিকাতেও নিজের নাম আরও উঁচুতে তুলেছেন ইয়ামাল। পুরো আসরজুড়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে তিনি নিজেকে ভবিষ্যৎ ব্যালন ডি’অরের অন্যতম দাবিদার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ফাইনালে মেসিকে স্বাভাবিক ছন্দে দেখা যায়নি। এর বড় কারণ ছিল স্পেনের পরিকল্পিত প্রেসিং ও মাঝমাঠের দখল। রদ্রি, পেদ্রি এবং স্প্যানিশ মিডফিল্ড বারবার মেসির কাছে বল পৌঁছানোর পথ বন্ধ করে দেয়। ফলে তিনি অধিকাংশ সময় মাঝমাঠে নেমে বল সংগ্রহ করতে বাধ্য হন এবং আক্রমণভাগে প্রভাব ফেলতে পারেননি। স্পেনের ডিফেন্ডাররা তাকে ঘিরে রাখায় ড্রিবল বা থ্রু পাসের সুযোগও খুব কম পেয়েছেন। ম্যাচের শেষ দিকে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখলে ১০ জনের আর্জেন্টিনা পুরোপুরি রক্ষণে সরে যেতে বাধ্য হয়। এতে মেসি আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং গোলের সুযোগ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

তবুও ম্যাচের শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। একের পর এক ১৩টি দুর্দান্ত সেভ করে তিনি আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ সময় ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। নিকো উইলিয়ামস, লামিনে ইয়ামাল ও ফেরান তোরেসদের একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ নস্যাৎ করে দেন এই বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক। তবে শেষ পর্যন্ত ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের শট আর ঠেকানো সম্ভব হয়নি।

এই জয়ের মাধ্যমে ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় তুলল স্পেন। আর লিওনেল মেসির জন্য এটি হয়ে থাকল এক বেদনাদায়ক বিদায়, যেখানে রূপকথার সমাপ্তি নয়, বরং ইতিহাস লিখল স্পেনের নতুন প্রজন্ম।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ