
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়েছে শান্তর দল, সেটিও এক দিনের বেশি সময় হাতে রেখেই। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে অলআউট করে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। সেই লক্ষ্য ১৩.৪ ওভারে ১ উইকেট হারিয়েই পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ।
২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার টেস্টে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এসে পেল দ্বিতীয় জয়। শুধু জয়ই নয়, ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে এবং ম্যাচের এক দিনেরও বেশি সময় বাকি থাকতেই এসেছে এই সাফল্য।
বাংলাদেশের ডারউইন-ইতিহাসের বড় অংশই লেখা হয়ে গিয়েছিল ম্যাচের প্রথম তিন দিনে। তৃতীয় দিন শেষ বেলায় শুরু হয়েছিল উপসংহার। চতুর্থ দিনের সকালে সেই উপসংহারটুকুও দারুণভাবে শেষ করল সফরকারী বাংলাদেশ।
মিরাজের ঘূর্ণিতে শেষ অস্ট্রেলিয়া
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে করা ৪২৬ রানের জবাবে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেছিল অস্ট্রেলিয়া। দিনের খেলা শুরুতে তাদের প্রয়োজন ছিল ইনিংস হার এড়ানোর জন্য আরও ৬৭ রান। হাতে ছিল ৬ উইকেট।
কিন্তু প্রথম সেশনেই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান মেহেদী হাসান মিরাজ। ৩১ ওভার ব্যাট করে প্রথম সেশনে ৩ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। তিনটি উইকেটই নেন মিরাজ।

চতুর্থ দিনের সকালের উইকেট থেকে টার্ন ও বাউন্স—দুটিই আদায় করে নিয়েছেন বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডার। তাঁর বোলিংয়ের সবচেয়ে কার্যকর জায়গা ছিল অফ স্টাম্পের বাইরের ফুটমার্ক।
৬০তম ওভারে বাঁক খাওয়া একটি বল লাফিয়ে উঠে ব্যাটের কানায় লাগে। সেটি কট বিহাইন্ডে পরিণত করে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে আরেকটি ধাক্কা দেন মিরাজ। এরপর বো ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও শেষ ব্যাটসম্যান নাথান লায়নকেও ফিরিয়ে দেন তিনি। সব মিলিয়ে ৬৬ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়েছেন মিরাজ। টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তাঁর ১৫তম পাঁচ উইকেট।
লাঞ্চ বিরতিতে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার ও ধারাভাষ্যকার ব্রেন্ডন জুলিয়ানের সঙ্গে নিজের বোলিং নিয়ে কথা বলেন মিরাজ। তিনি জানান, সহজভাবে বোলিং করাই ছিল তাঁর পরিকল্পনা। অফ স্টাম্পের বাইরে থাকা ফুটমার্কে বল ফেলে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং প্রতিটি ওভারে উইকেট নেওয়ার চিন্তা না করে শৃঙ্খলা ধরে রেখেছেন।
লাঞ্চের পরও সেই শৃঙ্খলা ধরে রাখেন মিরাজ। তবে শতরান করা ক্যামেরন গ্রিনের উইকেটটি আসে হাসান মাহমুদের হাত ধরে।
গ্রিনের সেঞ্চুরি, তবু অস্ট্রেলিয়ার পরাজয়
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে একাই লড়েছেন ক্যামেরন গ্রিন। ১০৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছেন তিনি। তাঁর সেঞ্চুরির সুবাদেই ইনিংস হার এড়াতে সক্ষম হয় অস্ট্রেলিয়া।
কিন্তু গ্রিনের একার লড়াই দলকে বড় লিড এনে দিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
লাঞ্চের সময় অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ছিল ৭ উইকেটে ২৪৩ রান। অর্থাৎ ১৫ রানের লিড নিয়ে হাতে ছিল মাত্র ৩ উইকেট। লাঞ্চের পর ১১.১ ওভারের মধ্যেই সেই তিন উইকেটও হারায় স্বাগতিকেরা।
প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া হাসান মাহমুদ দ্বিতীয় ইনিংসে গ্রিনকে ফিরিয়ে দেন। দুই ইনিংস মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ৯টি উইকেটই নিয়েছেন বাংলাদেশের এই পেসার।
৫৭ রানের লক্ষ্য, বাংলাদেশের জয় কেবল আনুষ্ঠানিকতা
অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া ৫৭ রানের লক্ষ্য বাংলাদেশের জন্য ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা। যদিও ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই জস হ্যাজলউডের বলে বোল্ড হয়ে ফিরে যান প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান।
তবে এরপর আর কোনো বিপদ হতে দেননি সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক। দুজন মিলে দলকে নিয়ে যান জয়ের বন্দরে।
সাদমান ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন। তিনে নামা অভিজ্ঞ মুমিনুল হক অপরাজিত থাকেন ৩০ রানে।
ওয়েবস্টারকে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি মেরে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন মুমিনুল।
এরপরই ডারউইনের গ্যালারি কেঁপে ওঠে একটাই স্লোগানে—‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।’
অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের হাততালি আর উচ্ছ্বাসে মুহূর্তের জন্য ডারউইনের মারারা স্টেডিয়াম যেন হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশেরই কোনো ক্রিকেট মাঠ।
ড্রেসিংরুমের সামনে তখন বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের আবেগঘন উদ্যাপন। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে ইতিহাসের এই জয় উদ্যাপন করেছেন তারা। আর বিপরীত চিত্র অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমে—মাঠ থেকে ড্রেসিংরুম, এমনকি প্রেসবক্স পর্যন্ত নেমে আসে স্তব্ধতা।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এই জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়; এটি দেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে লেখা হয়ে থাকল অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে।

