
রাহাত এবং অনন্যা হানিমুনে কক্সবাজার বেড়াতে গেছে। দুপুরের রোদে ঘুরে বেড়ানোর পর রিসোর্টের নীল পানির সুইমিং পুল দেখে অনন্যার চোখে যেন আনন্দের ঝিলিক। সে হাসিমুখে বলল, “আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না, এখনই পুলে নামব!”
রাহাত হেসে বলল,“পুলে নামবে, ভালো কথা। কিন্তু জানো, আমরা প্রায় সবাই সুইমিং পুলে নেমে এমন কিছু ভুল করি, যেগুলো নিজের অজান্তেই অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়?”
অনন্যা অবাক হয়ে জানতে চাইল,“কী ভুল?”
রাহাত তখন একে একে ব্যাখ্যা করতে শুরু করল। তার কথাগুলো শুধু অনন্যার জন্য নয়, আমাদের সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
১. ক্লোরিন সব জীবাণু সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলে—এ ধারণা ভুল
অনেকেই মনে করেন, পুলে ক্লোরিন থাকলেই সব জীবাণু মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যায়। বাস্তবে তা নয়।
সাধারণ ব্যাকটেরিয়া দ্রুত মারা গেলেও কিছু ভাইরাস ও Cryptosporidium নামের পরজীবী ক্লোরিনযুক্ত পানিতেও অনেক দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তাই পুলের পানি কখনোই হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মতো জীবাণুমুক্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পুলের পানি কখনো মুখে নেওয়া বা গিলে ফেলা উচিত নয়।
২. গোসল না করেই পুলে নেমে পড়া
সুইমিং পুলে নামার আগে ৩০ সেকেন্ডের একটি দ্রুত শাওয়ারও অনেক পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। এতে শরীরের ঘাম, সানস্ক্রিন, ত্বকের তেল এবং অদৃশ্য ময়লা ধুয়ে যায়। ফলে পুলের পানিও পরিষ্কার থাকে। পুল থেকে উঠে আবার গোসল করলে শরীরে থাকা ক্লোরিন ও সম্ভাব্য জীবাণুও দূর হয়।

৩. খোলা ক্ষত নিয়ে পানিতে নামা
হাতে কাটা, হাঁটু ছড়ে যাওয়া কিংবা অস্ত্রোপচারের সেলাইয়ের জায়গা পুরোপুরি না শুকালে পুলে নামা ঠিক নয়।কারণ ক্ষতস্থান দিয়ে জীবাণু শরীরে প্রবেশের সুযোগ পায়। প্রয়োজনে অবশ্যই ওয়াটারপ্রুফ ড্রেসিং ব্যবহার করতে হবে।
৪. পা ভালোভাবে না ধোয়া
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের শরীরের সবচেয়ে বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে পায়ের ত্বকে। সাবান দিয়ে ভালোভাবে পা ধুলে এসব জীবাণুর পরিমাণ অনেক কমে যায়। বিশেষ করে সমুদ্রসৈকত থেকে এসে পুলে নামার আগে পায়ের বালি ধুয়ে ফেলা জরুরি।
৫. পুলেই প্রস্রাব করা
অনেকেই এটিকে তেমন গুরুতর মনে করেন না। কিন্তু প্রস্রাবের সঙ্গে ক্লোরিনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ক্লোরামিন তৈরি হয়, যা ক্লোরিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় এবং সেই পরিচিত ‘পুলের গন্ধ’ তৈরি করে। তাই প্রয়োজন হলে অবশ্যই টয়লেটে যান।
৬. ভেজা সুইমিং ড্রেস দীর্ঘ সময় পরে থাকা
ভেজা পোশাক দীর্ঘক্ষণ পরে থাকলে ত্বকে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবাণু সহজেই বৃদ্ধি পায়। সাঁতার শেষে যত দ্রুত সম্ভব শুকনো পোশাক পরে নেওয়া এবং গোসল করা উচিত।
৭. সুইমিং ড্রেস না ধুয়ে আবার ব্যবহার করা
অনেকে মনে করেন, সারাদিন পানিতে থাকায় সুইমিং ড্রেস নিজেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। আসলে পোশাকে শরীরের কোষ, তেল, সানস্ক্রিন ও নানা ধরনের জীবাণু থেকেই যায়। প্রতিবার ব্যবহারের পর পরিষ্কার পানি কিংবা ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে নেওয়া উচিত।
৮. কানের ভেতরের পানি না বের করা
সাঁতার শেষে কানে পানি জমে থাকলে Swimmer’s Ear বা কানের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই মাথা একপাশে কাত করে পানি বের করুন এবং পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে বাইরের অংশ মুছে নিন।
৯. একই ভেজা তোয়ালে বারবার ব্যবহার
ভেজা তোয়ালে জীবাণু বহন করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা প্রতিবার পুলে যাওয়ার সময় পরিষ্কার ও শুকনো তোয়ালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। অন্যের তোয়ালেও ব্যবহার করা উচিত নয়।
১০. ছোট শিশুদের নিয়ম না মানিয়ে পুলে নামানো
শিশুরা সহজেই পানিতে জীবাণু ছড়িয়ে দিতে পারে। তাই নিয়মিত টয়লেট ব্রেক, পুলের বাইরে ডায়াপার পরিবর্তন এবং সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
১১. ডায়রিয়া সেরে যাওয়ার পরই পুলে নেমে পড়া
ডায়রিয়া ভালো হয়ে গেলেও কিছু জীবাণু শরীর থেকে আরও প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত ছড়াতে পারে। বিশেষ করে Cryptosporidium সংক্রমণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা অন্তত ১৪ দিন অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
সুইমিং পুল আনন্দের জায়গা, ভয় পাওয়ার নয়। তবে নিজের ছোট ছোট অভ্যাস বদলালেই সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক কমানো সম্ভব।
মনে রাখুন—
- পুলে নামার আগে ও পরে গোসল করুন।
- পুলের পানি গিলে ফেলবেন না।
- অসুস্থ অবস্থায় সাঁতার এড়িয়ে চলুন।
- ভেজা পোশাক দ্রুত বদলান।
- নিজের তোয়ালে ও সুইমিং ড্রেস সবসময় পরিষ্কার রাখুন।
এতে শুধু আপনি নন, আপনার সঙ্গে একই পুলে থাকা অন্যরাও নিরাপদ থাকবেন।
সূত্র: ইয়াহু নিউজ


