
তমালের চোখে তখন একরাশ স্বপ্ন। এইচএসসি পাস করে গ্রামের ছোট্ট বাড়ি থেকে ঢাকায় এসেছে। ভর্তি হয়েছে দেশের স্বনামধন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবা বিদায়ের সময় বলেছিলেন, “মানুষ হবি, শুধু বড় চাকরি করলেই হবে না।” সেই কথাই বুকে নিয়ে নতুন ক্যাম্পাসে পা রাখে সে।
কিন্তু ক্লাস শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই বদলে যায় সবকিছু। এক রাতে কয়েকজন সিনিয়র তাকে ডেকে নিয়ে যায়। অশালীন প্রশ্ন, অপমান, জোর করে গান গাওয়ানো, শাস্তি, কটু কথা—একসময় কান্না চেপে রাখতে পারেনি তমাল। পরদিন ক্লাসে গেলেও কারও চোখে চোখ রাখতে পারেনি। মনে হয়েছিল, সে যেন অপরাধী।
বছর পেরিয়ে তমাল এখন একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। তবু অফিসে কোনো সিনিয়র কড়া গলায় ডাকলেই বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে সেই রাতের স্মৃতি। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায়। তখনও তার মনে প্রশ্ন জাগে—”যাদের আমি বড় ভাই ভাবতাম, তারা আমার সঙ্গে এমন করতে পারল কীভাবে?”
তমাল কাল্পনিক। কিন্তু তার গল্পটি বাংলাদেশের হাজারো শিক্ষার্থীর বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি।
স্বপ্নের পথে বাধার দেয়াল, বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভর্তি হওয়া মানেই নতুন এক অধ্যায়ের শুরু। নতুন বন্ধু, নতুন ক্যাম্পাস, নতুন স্বপ্ন—সবকিছু ঘিরে থাকে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই অনেক শিক্ষার্থীর সামনে প্রথম বাধা হয়ে দাঁড়ায় র্যাগিং।
দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষাবর্ষের শুরুতে কোনো না কোনোভাবে র্যাগিংয়ের অভিযোগ ওঠে। কিছু স্কুল ও কলেজেও নতুন শিক্ষার্থীরা একই ধরনের মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। সিনিয়রদের কাছে এটি অনেক সময় ‘পরিচিতি পর্ব’ বা ‘র্যাগ ডে’ নামে পরিচিত হলেও বাস্তবে অনেকের জন্য এটি ভয়, অপমান ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমার সূচনা।
“র্যাগিং কখনোই পরিচিতির মাধ্যম হতে পারে না; এটি অনেক শিক্ষার্থীর জন্য আজীবনের মানসিক ক্ষতের শুরু।”
র্যাগিংয়ের ইতিহাস: কোথা থেকে এলো এই সংস্কৃতি?
ইতিহাসবিদদের মতে, র্যাগিংয়ের ধারণার উৎপত্তি প্রাচীন গ্রিক সমাজে। সপ্তম-অষ্টম শতকে খেলোয়াড়দের মধ্যে দলগত চেতনা গড়ে তুলতে এর প্রাথমিক রূপ দেখা যায়। পরে ইউরোপের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এটি ছড়িয়ে পড়ে।
১৮২৮ থেকে ১৮৪৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘র্যাগ উইক’ চালু হয়। ছাত্রসংগঠন পাই, আলফা, বিটা, কাপ্পা এ সংস্কৃতি বিস্তারে ভূমিকা রাখে।
অদ্ভুত বিষয় হলো, ইউরোপ ও আমেরিকায় শুরু হলেও বর্তমানে ভারতীয় উপমহাদেশেই র্যাগিং সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে ভারতে র্যাগিংকে কেন্দ্র করে আত্মহত্যা, শারীরিক নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
কেন র্যাগিং করে সিনিয়ররা?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, র্যাগিংয়ের পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ কাজ করে—
- নতুন শিক্ষার্থীদের অবচেতন মনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা।
- নিজের অপূর্ণতা ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো।
- ক্ষমতা প্রদর্শনের মানসিকতা।
- অতীতে নিজে র্যাগিংয়ের শিকার হওয়ার প্রতিশোধ নেওয়া।
- ভবিষ্যতে অনৈতিক কাজে নতুনদের ব্যবহার করার মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করা।
“যে শিক্ষার্থী একসময় র্যাগিংয়ের শিকার হয়, সে-ই পরের বছর অনেক সময় একই নির্যাতনের অংশ হয়ে ওঠে—এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর চক্র।”
মানসিক ক্ষত, যা থেকে যায় বহু বছর
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অনেক শিক্ষার্থীই গ্রাম কিংবা মফস্বল শহর থেকে আসে। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার আগেই যদি অপমান ও ভয় তাদের ঘিরে ধরে, তবে সেটি গভীর মানসিক আঘাত তৈরি করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, র্যাগিংয়ের ফলে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে দেখা দিতে পারে—
- আত্মবিশ্বাস হারানো
- বিষণ্নতা
- সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
- উদ্বেগ ও আতঙ্ক
- দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা
- চরম ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবণতা
অনেকে কর্মজীবনেও সেই মানসিক চাপ বহন করেন। কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর, নতুন পরিবেশ কিংবা সিনিয়রদের আচরণ তাদের অতীতের ভয়াবহ স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
প্রতিশোধের চক্র
র্যাগিংয়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর প্রতিশোধমূলক সংস্কৃতি।
অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, “আমি সহ্য করেছি, তাই নতুনদেরও সহ্য করতে হবে।”
এই মানসিকতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে র্যাগিংকে টিকিয়ে রাখছে। ফলে ভুক্তভোগীই একসময় নির্যাতনকারীতে পরিণত হয়।
র্যাগ ডে নয়, হোক গুড ডে
ইতোমধ্যে দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় র্যাগিংবিরোধী কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। কোথাও র্যাগিং প্রমাণিত হলে বহিষ্কার পর্যন্ত করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনটি ভয় নয়, হোক বন্ধুত্বের। অপমান নয়, হোক আন্তরিক পরিচয়ের।
নতুনদের স্বাগত জানাতে গান হতে পারে, সাংস্কৃতিক আয়োজন হতে পারে, খেলাধুলা হতে পারে—কিন্তু কোনোভাবেই মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন নয়।
কারণ একজন শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হওয়া উচিত সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিয়ে; অপমান দিয়ে নয়।
“র্যাগ ডে নয়, গুড ডে—বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন হোক সম্মান, বন্ধুত্ব ও নিরাপদ সহাবস্থানের প্রতীক।”

