‘বার্থ ট্যুরিজম’ বন্ধে ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ, বদলাবে নাগরিকত্বের নিয়ম

যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে শিশুকে মার্কিন নাগরিকত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশিদের দেশটিতে যাওয়ার প্রবণতাকে বলা হয় ‘বার্থ ট্যুরিজম’। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুটি নির্বাহী আদেশকে কেন্দ্র করে। এর একটি বার্থ ট্যুরিজম বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। অন্যটি নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ সীমিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব কী

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্ব পাওয়ার নীতিকে আইনগতভাবে ‘জুস সলি’ (jus soli) বা ‘মাটির অধিকার’ বলা হয়। এর ভিত্তি দেশটির সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী। গৃহযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সাবেক দাসদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে ১৮৬৮ সালে এই সংশোধনী গৃহীত হয়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রায় সব শিশুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পায়। বাবা-মা মার্কিন নাগরিক না হলেও সাধারণত এতে বাধা হয় না। তবে বিদেশি কূটনীতিকদের সন্তানসহ কিছু সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে।

কী এই ‘বার্থ ট্যুরিজম’

বিদেশি নাগরিকেরা শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করলে সেটিকে বার্থ ট্যুরিজম বলা হয়। সন্তান সেখানে জন্ম নিলে সাধারণত নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকায় এ ধরনের ভ্রমণের আগ্রহ তৈরি হয়।

পর্যটন ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া নিজে অবৈধ নয়। তবে সন্তান জন্ম দেওয়াই যদি ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য হয় এবং সেটি গোপন করে ভিসা নেওয়া বা ভিসার অপব্যবহার করা হয়, তাহলে তা আইনগত সমস্যার কারণ হতে পারে।

বার্থ ট্যুরিজমের সঠিক সংখ্যা নিয়ে সরকারি কোনো নির্ভুল পরিসংখ্যান নেই। কারণ কোনো নারী সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন কি না, শুধু জন্মনিবন্ধনের তথ্য থেকে তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

বছরে কত শিশু বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে জন্ম নেয়

সিডিসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি ঠিকানা দেওয়া মায়েদের কাছে ৯ হাজার ৫০০টির কিছু বেশি শিশু জন্ম নেয়। ওই বছর দেশটিতে মোট জন্ম হয় প্রায় ৩৬ লাখ ৩০ হাজার। ফলে বিদেশি ঠিকানা দেওয়া মায়েদের সন্তান মোট জন্মের প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। তবে এই শিশুদের সবাইকে বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া বলা যায় না।

ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশে কী আছে

ট্রাম্পের নতুন দুটি নির্বাহী আদেশের একটি বার্থ ট্যুরিজম ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে আরও কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ ও ভিসা ব্যবস্থাপনার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যটি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যতিক্রমের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন ট্রাম্প। ওই আদেশে অস্থায়ী ভিসাধারী বা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী অভিবাসীদের সন্তানদের স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করা হয়।

তবে ২০২৬ সালের ৩০ জুন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের ওই উদ্যোগের বিরুদ্ধে রায় দেয়। আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রায় সব শিশুর নাগরিকত্বের সাংবিধানিক ভিত্তি বহাল রাখেন।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী, ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্বের বিধান যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। ফলে বাবা-মায়ের অভিবাসন-অবস্থা বিবেচনা করে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এ অধিকার ব্যাপকভাবে সীমিত করার উদ্যোগ আইনি বাধার মুখে পড়ে।

বার্থ ট্যুরিজম নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বার্থ ট্যুরিজম বর্তমান জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ব্যবস্থার অপব্যবহারের একটি উদাহরণ। প্রশাসন মনে করছে, সন্তানকে মার্কিন নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের প্রবণতা বন্ধ করা প্রয়োজন।

তবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ও দেখিয়েছে, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ১৪তম সংশোধনীর দীর্ঘদিনের ব্যাখ্যা পরিবর্তন করা সহজ নয়।

কোন কোন দেশে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব আছে

বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশে কোনো না কোনোভাবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকোসহ লাতিন আমেরিকার বেশির ভাগ দেশে এ নীতি কার্যকর।

উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সাধারণত বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন-অবস্থা নির্বিশেষে দেশটিতে জন্ম নেওয়া শিশুকে নাগরিকত্ব দেওয়ার দীর্ঘদিনের ব্যবস্থা রয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সীমিত। সেখানে সাধারণত অন্তত একজন বাবা-মা নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা হলে শিশুর জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার তৈরি হয়।

ফলে ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ শুধু বার্থ ট্যুরিজম বন্ধের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়ে নতুন আইনি বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ