মানবতাবিরোধী মামলায় ইনুর ১০ বছরের সাজা

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

রায় ঘোষণার সময় হাসানুল হক ইনু আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। দুপুর ১টা ৪২ মিনিটে তাকে হাজতখানা থেকে এজলাসে আনা হয়। এরপর ২১১ পৃষ্ঠার রায় পাঠ শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ পাঠ করেন এবং বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ সাক্ষ্য-প্রমাণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। রায়ের কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। দীর্ঘ তদন্ত শেষে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জমা দেওয়া হয়। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হলে আদালত তা আমলে নিয়ে ইনুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

পরবর্তীতে দীর্ঘ শুনানি শেষে ২ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ৩০ নভেম্বর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু হয় এবং ১ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।

মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন দুজন। এছাড়া আদালতে ২০টি সিরিজের নথি এবং পাঁচটি বস্তুগত আলামত উপস্থাপন করা হয়। যুক্তিতর্ক শেষ হয় চলতি বছরের ১৪ মে। ওইদিন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয় এবং পরে ৩০ জুন রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়।

প্রসিকিউশনের আনা আটটি অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতের মুম্বাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিরর নাউ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসানুল হক ইনু আন্দোলনকারীদের বিএনপি-জামায়াত ও সন্ত্রাসী-জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের পক্ষে বক্তব্য দেন।

এছাড়া ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে অংশ নিয়ে আন্দোলন দমনে নেওয়া সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০ জুলাই তিনি কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে আন্দোলনকারীদের ছবি সংগ্রহ করে তালিকা তৈরিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র সদস্যরা ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। এতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন এবং বহু মানুষ আহত হন।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি, বোমা হামলা, আটক ও নির্যাতনের মতো পদক্ষেপে উসকানি ও পরিকল্পনায়ও ভূমিকা রাখেন ইনু। একই সঙ্গে কারফিউ জারি ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড এবং নির্যাতনকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া ২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আরেকটি ১৪ দলীয় বৈঠকে উপস্থিত থেকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন এবং ৪ আগস্ট কারফিউ জারি ও ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে গুলি চালানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন বলেও প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ