
বোস্টনের আকাশে তখন গোধূলির শেষ আলো। গ্যালারির এক পাশে নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা, অন্য পাশে প্রার্থনা। ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে ভাগ্য নির্ধারণের মঞ্চে দাঁড়িয়ে দুই দলের স্বপ্ন। তারপর একের পর এক পেনাল্টি, একের পর এক নাটক। শেষ বাঁশি বাজার আগেই যেন ইতিহাস নিজের নতুন অধ্যায় লিখে রেখেছিল। আর সেই ইতিহাসের নায়ক হয়ে উঠল দক্ষিণ আমেরিকার ছোট্ট দেশ প্যারাগুয়ে।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৪১ নম্বর দল প্যারাগুয়ে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর সাডেন ডেথে হোসে কানালের জয়সূচক শটে নিশ্চিত হয় প্যারাগুয়ের ঐতিহাসিক জয়।

টাইব্রেকারের শুরুতেই জার্মানির কাই হাভার্টজের শট ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। এরপর নিক ভল্টমেডের শটও ব্যর্থ হয়। সবশেষে জোনাথন তাহ বল বারের অনেক ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারলে জার্মানির বিদায় নিশ্চিত হয়।
ম্যাচের শুরু থেকেই অভিজ্ঞ আর্জেন্টাইন কোচ গুস্তাভো আলফারোর কৌশলে রক্ষণাত্মক ৪-৫-১ ফরমেশনে দুর্ভেদ্য দেয়াল গড়ে তোলে প্যারাগুয়ে। প্রথমার্ধে ৭৮ শতাংশ বল দখলে রেখেও জার্মানি প্রতিপক্ষের গোলমুখে কার্যকর কোনো শট নিতে পারেনি।
৪২তম মিনিটে প্রথম সফল কাউন্টার অ্যাটাক থেকেই এগিয়ে যায় প্যারাগুয়ে। মিগুয়েল আলমিরোনের পাস থেকে মাতিয়াস গ্যালারজার ক্রসে দারুণ হেডে গোল করেন মাত্র ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার হুলিও এনসিসো। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটিই ছিল প্যারাগুয়ের ইতিহাসের প্রথম গোল।
বিরতির পর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে জার্মানি। ৫৪ মিনিটে ফ্লোরিয়ান ভির্টজের নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে সমতা ফেরান কাই হাভার্টজ। এরপর দুই দলই একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও নির্ধারিত সময় শেষ হয় ১-১ সমতায়।
অতিরিক্ত সময়ের ১০২তম মিনিটে জোনাথন তাহের হেডে জার্মানি গোল পেলেও দীর্ঘ ভিএআর পর্যালোচনার পর সেটি বাতিল করা হয়। গোল হওয়ার আগে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষককে ফাউল করার অভিযোগে গোলটি বাতিল হলে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।

সেখানেই জন্ম নেয় বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনও পেনাল্টি শুটআউটে হারেনি জার্মানি। ১৯৭৬ সালের ইউরো ফাইনালের পর এই প্রথম কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে টাইব্রেকারে পরাজয়ের স্বাদ পেল তারা। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ের পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও শেষ ৩২ থেকেই ছিটকে গেল ইউলিয়ান নাগেলসম্যানের দল।
হারের পর হতাশা লুকাননি জার্মান অধিনায়ক জশুয়া কিমিচ।
“আমরা রেফারি বা ভাগ্যকে দোষ দিতে পারি না। ১২০ মিনিটে যদি প্যারাগুয়েকে হারাতে না পারি, তাহলে বিদায় নেওয়াটাই আমাদের প্রাপ্য।”
জার্মান কোচ ইউলিয়ান নাগেলসম্যানও বলেন,
“যদি আপনি প্যারাগুয়ের কাছে হেরে বিদায় নেন, তাহলে আপনি প্রথম সারির দল নন। আমি ভীষণ হতাশ। জার্মান ফুটবলের জন্য এটি যথেষ্ট নয়।”
অন্যদিকে ৭৬ লাখ মানুষের দেশ প্যারাগুয়েতে বইছে উৎসবের বন্যা। ২০১০ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল দলটি। তিনটি বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা না পাওয়ার হতাশা কাটিয়ে এবার শেষ ষোলোয় উঠেছে তারা।
প্যারাগুয়ের অধিনায়ক গুস্তাভো গোমেজ বলেন,
“জার্মানিও জানত, আমাদের হারাতে হলে তাদের রক্ত ঝরাতে হবে। কারণ আমরা আমাদের পরাজয়ের মূল্য অনেক বেশি নির্ধারণ করে রেখেছিলাম।”
ম্যাচের নায়ক গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল বলেন,
“জার্মানির প্রতিটি খেলোয়াড়কে আমরা বিশ্লেষণ করেছি। সেই প্রস্তুতির কারণেই দুটি পেনাল্টি ঠেকাতে পেরেছি।”
শেষ ষোলোতে ফিলাডেলফিয়ায় এখন ফ্রান্স অথবা সুইডেনের মুখোমুখি হবে প্যারাগুয়ে।
জার্মানিকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ার পর পুরো প্যারাগুয়েজুড়ে শুরু হয়েছে উৎসব। রাজধানী আসুনসিওনসহ দেশের বিভিন্ন শহরের রাস্তায় নেমে আসেন হাজারো সমর্থক। ঐতিহাসিক এই জয় উদযাপনে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা ৩০ জুন দেশজুড়ে এক দিনের জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেন। সরকারি ডিক্রিতে বলা হয়, বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করে দেশের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনার স্বীকৃতিস্বরূপ এই ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।



