
কখনো কখনো ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়, এটি হয়ে ওঠে একটি জাতির বহু বছরের অপেক্ষা, বেদনা আর স্বপ্নের গল্প। আকাশজুড়ে কালো মেঘ, বজ্রপাত আর মুষলধারে বৃষ্টিতে ম্যাচ শুরু হতে দেরি হয়েছিল এক ঘণ্টা। কিন্তু এস্তাদিও আজতেকার গ্যালারিতে বসা হাজার হাজার মেক্সিকান সমর্থকের হৃদয়ের আগুন নিভিয়ে দিতে পারেনি প্রকৃতিও। বরং সেই গর্জনকে সঙ্গী করেই ৪০ বছরের অভিশাপ ভেঙে নতুন ইতিহাস লিখল স্বাগতিক মেক্সিকো।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে সহ-আয়োজক দেশটি। একই সঙ্গে ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল এল ত্রি। দীর্ঘ চার দশক ধরে নকআউটে বারবার হতাশা সঙ্গী হলেও এবার সেই অধ্যায়ের ইতি টানল মেক্সিকো।
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য কিছুটা চাপে ছিল স্বাগতিকরা। ১৫ মিনিটে কর্নার থেকে সুযোগ তৈরি করলেও মোরার বাঁকানো শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তিন মিনিট পর গনজালো প্লাতার দুর্দান্ত ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে জন ইয়েবোয়ার সামনে গোলের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু তার জোরালো শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে।

সেই ধাক্কা সামলে ২২ মিনিটেই পাল্টা আঘাত হানে মেক্সিকো। দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাকে ইকুয়েডরের রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে নিখুঁত ফিনিশে জুলিয়ান কিনিয়োনেস গোল করে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন।
গোলের পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে মেক্সিকো। ৩১ মিনিটে আজতেকাকে আবারও উল্লাসে ভাসান অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রাউল হিমেনেস। ইকুয়েডরের ডিফেন্ডার উইলিয়ান পাচো? (আপনার তথ্য অনুযায়ী অর্ডোনজ)–এর ভুল ক্লিয়ারেন্স থেকে বল পেয়ে কিনিয়োনেসের সঙ্গে দারুণ ওয়ান-টু পাস খেলেন তিনি। এরপর বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের দুর্দান্ত শটে বল জড়ান জালের ওপরের কোণে। প্রথমার্ধেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় মেক্সিকো।
দ্বিতীয়ার্ধে গোল শোধে মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালায় ইকুয়েডর। বলের দখলও ছিল তাদের বেশি। তবে মেক্সিকোর সুসংগঠিত রক্ষণ আর গোলরক্ষক রাউল রাঙ্গেলের দৃঢ়তায় বারবার ব্যর্থ হয় লাতিন আমেরিকার দলটি।
যোগ করা সময়ের নাটকীয়তায় ইকুয়েডরের হতাশা আরও বাড়ে। প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সময় ডিফেন্ডার পিয়েরো হিনকাপিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলে মনে করেন রেফারি। সঙ্গে সঙ্গেই তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয়। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পর ইকুয়েডরের শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়।
শেষ বাঁশি বাজতেই উৎসবে ফেটে পড়ে আজতেকা। ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউটে জয়—যে অপেক্ষা ছিল ৪০ বছরের। ১৯৯৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত টানা সাতবার নকআউটে বিদায় নিয়েছিল মেক্সিকো, আর ২০২২ বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ পর্বই পেরোতে পারেনি। সেই হতাশার অধ্যায় পেছনে ফেলে এবার নতুন ইতিহাসের পথে হাঁটছে তারা।
এবারের বিশ্বকাপে এটি মেক্সিকোর ৯ম বারের মতো শেষ ষোলোয় ওঠা। নতুন ৪৮ দলের বিশ্বকাপ কাঠামোয় প্রথমবার শেষ ৩২ পেরিয়ে তারা শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে তাদের সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা—ইংল্যান্ড অথবা ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে লড়াই।
মেক্সিকোর সংবাদমাধ্যম ও সমর্থকদের প্রতিক্রিয়াতেও ফুটে উঠেছে বহু বছরের জমে থাকা আবেগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “¡Viva México!”, “Sí se puede” (হ্যাঁ, আমরা পারি) এবং “El quinto partido” (কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন) স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠেন সমর্থকেরা। অনেকের বিশ্বাস, এটি শুধু ৪০ বছরের অভিশাপ ভাঙার গল্প নয়; বরং ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখার সূচনা। ম্যাচ শেষে মেক্সিকোর কোচ হাভিয়ের আগিরে বলেন, “এই জয় শুধু আমাদের দলের নয়, পুরো মেক্সিকোর মানুষের। সমর্থকদের অসাধারণ সমর্থন আমাদের শক্তি জুগিয়েছে।”
সূত্র: রয়টার্স


