ইউক্রেনে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার হামলা; নিহত চার

রাশিয়া ইউক্রেনে হাইপারসনিক ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। সর্বশেষ যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করার পরই এই হামলা চালানো হয়। রাতভর চালানো হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে আবাসিক ভবনে আগুন ধরে যায় এবং অন্তত চারজন নিহত হন।

যুদ্ধ প্রায় চার বছরে গড়ানোর মুখে ইউক্রেন ও তার পশ্চিমা মিত্ররা সংঘাতের অবসান ঘটাতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। এ সপ্তাহে তারা একমত হয়েছে যে, ভবিষ্যতে কোনো যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনে শান্তিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন করবে। তবে রাশিয়া বরাবরই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে। মস্কোর দাবি, ন্যাটো সম্প্রসারণ ঠেকাতেই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা ইউক্রেনে অভিযান শুরু করে।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইউক্রেনে মোতায়েন যেকোনো পশ্চিমা সেনা “বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু” হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি ইউক্রেন ও তার মার্কিন ও ইউরোপীয় মিত্রদের ‘যুদ্ধের অক্ষ’ বলে আখ্যা দেন।

কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানান, “শত্রুর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়” শহরের কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ড্রোন হামলায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত চারজন নিহত ও ২৪ জনের বেশি আহত হন।

অন্যদিকে, রাশিয়ার সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ অঞ্চলে ইউক্রেনের হামলায় বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অঞ্চলটির গভর্নর ভিয়াচেস্লাভ গ্লাদকভ জানান, পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিদ্যুৎ ও গরমের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং প্রায় দুই লাখ মানুষ পানির সংকটে পড়েছেন।

ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী শুক্রবার ভোরে দেশজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা জারি করে জানায়, রুশ বোমারু বিমান আকাশে উড়ছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লভিভে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘অবকাঠামোগত স্থাপনায়’ আঘাত হানে বলে ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনী জানায়। ক্ষেপণাস্ত্রটি ঘণ্টায় প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার গতিতে চলছিল। পরে আঞ্চলিক প্রশাসন জানায়, বিকিরণের মাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের শেষ দিকে রাশিয়া প্রচলিত ওয়ারহেডযুক্ত ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মধ্য ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরে হামলা চালিয়েছিল।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিয়েভ দূতাবাস বৃহস্পতিবার সতর্ক করে জানায়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে “গুরুত্বপূর্ণ বিমান হামলার” আশঙ্কা রয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও তার সন্ধ্যার ভাষণে একই ধরনের সতর্কবার্তা দেন।

দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পর শত শত হাজার পরিবার এখনো বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে রয়েছে। দিনিপ্রো শহরের মেয়র বরিস ফিলাতভ একে “জাতীয় পর্যায়ের জরুরি অবস্থা” বলে বর্ণনা করেছেন।

কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও শান্তিচুক্তি এখনো অনিশ্চিত। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বলেন, রাশিয়ার অবস্থানের কারণে যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখনো “অনেক দূরে”। প্যারিসে এক শীর্ষ সম্মেলনের পর রাশিয়া ইউরোপীয় ও মার্কিন প্রস্তাবিত যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে “বিপজ্জনক” ও “ধ্বংসাত্মক” বলে আখ্যা দেয়।

এ ছাড়া ভূখণ্ডগত বিরোধও অমীমাংসিত। ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা দখলে রাখা রাশিয়া যেকোনো সমঝোতার অংশ হিসেবে পুরো দোনবাস অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে, যা কিয়েভ প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মধ্যেই রাশিয়ার সেনাবাহিনী দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে আরও একটি গ্রাম দখলের দাবি করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই সংঘাতে কূটনীতিকরা সমাধানের পথ খুঁজলেও, রাশিয়া প্রতিদিনই ইউক্রেনে হামলা জোরদার করে চলেছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, “কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে” ওরেশনিক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে চালানো একটি ড্রোন হামলার জবাব। তবে ইউক্রেন ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ