ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নতুন আশা

দীর্ঘ কয়েক মাসের উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার পথে হাঁটতে সম্মত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামে পরিচিত এই চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল।

চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো দুই দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ রাখবে। শুধু সরাসরি সংঘর্ষই নয়, লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ফ্রন্টগুলোতেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। এর বিনিময়ে ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবাধ রাখবে। প্রাথমিকভাবে ৬০ দিনের জন্য জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা বা অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ না করার বিষয়েও সম্মতি দেওয়া হয়েছে।

চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পারমাণবিক ইস্যু। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে দুই দেশ নতুন করে আলোচনা শুরু করবে। এসব আলোচনায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তদারকি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইরান এখন পর্যন্ত চুক্তির শর্ত মেনে চলছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করার মতো পরবর্তী পদক্ষেপগুলো।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্যও এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। সংঘাতের কারণে এই রুটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় সেই চাপ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চুক্তির পর বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়াও ছিল ইতিবাচক। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

রাশিয়া চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেছে যে এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কূটনৈতিক সমাধানের পথ সুগম করবে। ক্রেমলিনের মতে, সংঘাতের অবসান বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য ‘স্বস্তির মুহূর্ত’ নিয়ে এসেছে। যুক্তরাজ্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ৬০ দিনের আলোচনা সফল হলেই এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ নিতে পারবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ