
বিদেশ থেকে একটি ভেন্টিলেটর আমদানি করতে যেখানে ২০ লাখ টাকারও বেশি ব্যয় হয়, সেখানে মাত্র এক লাখ টাকায় দেশেই ভেন্টিলেটর তৈরির দাবি করেছেন তিন বাংলাদেশি গবেষক। সাত বছরের গবেষণার পর তারা তৈরি করেছেন ‘ভেন্টাস’ নামে একটি ভেন্টিলেটর, যা ইতোমধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের হিউম্যান ট্রায়ালে সফল হয়েছে বলে জানিয়েছেন।
এই গবেষণা দলের সদস্যরা হলেন জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের আইসিইউ কনসালটেন্ট ডা. আসিফ উর রহমান, কার্ডিওলজির পোস্টগ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি সিফায়েত ইনাম স্বাক্ষর এবং প্রকৌশলী বায়েজিদ শুভ।
গবেষকদের দাবি, ভেন্টাস এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি সহজে বহন করা যায়, কম খরচে উৎপাদন করা সম্ভব হয় এবং প্রয়োজনীয় শ্বাস-প্রশ্বাসে কার্যকর সহায়তা দিতে পারে। গত মে মাসে যন্ত্রটির প্রাথমিক পর্যায়ের সফল হিউম্যান ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে।

তারা জানান, ট্রায়ালের সময় রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন, রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার ও চেতনার মাত্রাসহ গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরে আর্টেরিয়াল ব্লাড গ্যাস (এবিজি) পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর অক্সিজেনেশন ও ভেন্টিলেশনের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে ভেন্টাস প্রত্যাশিতভাবে রোগীকে কার্যকর শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়তা দিতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি তাদের।
ডা. আসিফ উর রহমান বলেন, বিদেশ থেকে একটি ভেন্টিলেটর আনতে ২০ লাখ টাকারও বেশি ব্যয় হয়, পাশাপাশি রয়েছে আমদানি প্রক্রিয়ার নানা জটিলতা। কিন্তু তাদের তৈরি ভেন্টাসের বেসিক সংস্করণ মাত্র এক লাখ টাকায় তৈরি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, তিনটি পূর্ণাঙ্গ ভেন্টিলেশন মোড যুক্ত করতে সর্বোচ্চ আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা ব্যয় হবে। আর আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করতে পাঁচ লাখ টাকার বেশি লাগবে না, যা বিদেশি প্রায় ২০ লাখ টাকার ভেন্টিলেটরের সমমানের সেবা দিতে সক্ষম হবে বলে তারা আশা করছেন।
ডা. আসিফ জানান, ২০২০ সালের শুরুতে সিফায়েত ইনাম স্বাক্ষর ও বায়েজিদ শুভ তার সঙ্গে ভেন্টাসের ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন। লক্ষ্য ছিল এমন একটি যন্ত্র তৈরি করা, যা মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রাখতে পারবে এবং প্রয়োজনে ভেন্টিলেটরের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।
এই উদ্যোগের প্রথম ফল ছিল ‘স্পন্দন’ নামের একটি যন্ত্র। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এর প্রাথমিক কার্যকারিতা প্রমাণিত হলেও বিভিন্ন কারণে সেটি আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে সেই ব্যর্থতায় থেমে না গিয়ে তারা গবেষণা চালিয়ে যান। দীর্ঘ সময়ের উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত পরিমার্জনের মাধ্যমে তৈরি হয় ভেন্টাস, যা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে জটিল রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার উপযোগী করে ডিজাইন করা হয়েছে।
গবেষকদের ভাষ্য, ভেন্টাসের প্রথম সংস্করণ উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও ব্যবহার করা যাবে। পরবর্তী উন্নত সংস্করণগুলো জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি ভেন্টিলেশন মোডের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ কার্যকর হয়েছে এবং বাকি দুটি মোডের সফটওয়্যার কোডিং শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সেগুলোও চালু করা হবে।
গত ১২ জুলাই ভেন্টাস ব্যবহার করে দুই ঘণ্টা এক রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করা হয়। গবেষকদের দাবি, ওই পরীক্ষায় ব্যবহৃত বিদেশি ভেন্টিলেটরের সঙ্গে রোগীর শারীরিক সূচকে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি। এর আগেও একটি মেডিকেল বোর্ড যন্ত্রটির প্রাথমিক ট্রায়াল পর্যালোচনা করে সন্তোষ প্রকাশ করেছে বলে জানান তারা।
ডা. আসিফ উর রহমান বলেন, ভেন্টাস-১ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি অক্সিজেন প্ল্যান্ট বা অক্সিজেন সিলিন্ডারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে পরিবেশের বাতাস ব্যবহার করেই রোগীকে প্রয়োজনীয় শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা করতে পারে।
তিনি জানান, যন্ত্রটি পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হবে না। রোগীর শ্বাসনালিতে টিউব সংযুক্ত করে একটি বোতাম চাপলেই এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করবে।
গবেষকরা মনে করছেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে ভেন্টাসের গবেষণা, উন্নয়ন ও গণউৎপাদন আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
ডা. আসিফ বলেন, দেশের মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় এই উদ্ভাবন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে সরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে উৎপাদনে যেতে চান তারা। একই সঙ্গে উদ্ভাবনের স্বত্ব বাংলাদেশ ও গবেষক দলের কাছেই সংরক্ষিত থাকবে। সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে বিদেশেও রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র: বিডিনিউজ


