
২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় সংবিধান অনুযায়ী সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদের শপথ কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
স্পিকার বলেন, “শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র আমি হাতে পেয়েছি। স্পিকার হিসেবে আমি সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি। ফলে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বর্তমানে আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।”
তিনি আরও বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
সংবিধান কী বলছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন।
এছাড়া ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্যদিকে সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
নতুন রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন?
বর্তমান জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ নিয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে কয়েক দিন ধরেই আলোচনা চলছে।
বঙ্গভবন সূত্রে জানা গেছে, মো. সাহাবুদ্দিন কয়েক দিন আগেই নীতিগতভাবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিদায়ের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছিলেন। তবে স্পিকার বিদেশে থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা চলছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চলতি বছরের মে মাসে বিদেশ সফরের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির টেলিফোনে কথা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়। তবে এসব তথ্যের বিষয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কোনো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও চীন সফর শেষে দেশে ফিরলেও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেননি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা ও অসন্তোষ দেখা দেয়। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা বিভিন্ন সময়ে তাঁর পদত্যাগের দাবি তুলেছিলেন।
২০২৩ সালে দায়িত্ব নিয়েছিলেন
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৭৫ বছর বয়সী মো. সাহাবুদ্দিন। পাঁচ বছরের মেয়াদ অনুযায়ী তাঁর দায়িত্ব ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা কি আগে ঘটেছে?
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে স্পিকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের বিধান শুরু থেকেই রয়েছে। তবে দায়িত্বে থাকা কোনো রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছা পদত্যাগের পর স্পিকারের এভাবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের ঘটনা দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।
অতীতে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়েছে মূলত মৃত্যু, সামরিক বা রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে। যেমন ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয় এবং তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক পালাবদলের সময়ও রাষ্ট্রপতির পদে পরিবর্তন এসেছে। তবে দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছা পদত্যাগের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ও বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে।


