বাংলাদেশসহ ৩ দেশের মুরগির মাংসে মিলল অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল

লন্ডনের রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজের (আরভিসি) নতুন এক গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের পোলট্রি মুরগির মাংসে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের অবশিষ্টাংশ (রেসিডিউ) পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নমুনায় এই ওষুধের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার চেয়েও বেশি ছিল।

পোলট্রি মুরগির মাংসে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের অবশিষ্টাংশ (রেসিডিউ) নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন মাংস নিয়মিত খেলে শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী (অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্ট) ব্যাকটেরিয়া তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণেও প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নাও হতে পারে, যা চিকিৎসাকে জটিল করে তোলে। পাশাপাশি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অ্যালার্জি, অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং হজমজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, কারণ তাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন অঙ্গ এখনও বিকাশমান। একই পরিমাণ অবশিষ্টাংশ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীরে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন এমন খাদ্য গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে সংক্রমণের চিকিৎসা কঠিন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পোলট্রি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণাটি পরিচালনা করেছে রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজ। এতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানও অংশ নেয়।

বর্তমানে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাংস উৎপাদনকারী প্রাণীতে অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারের ফলে এ সমস্যা আরও জটিল হচ্ছে। প্রাণীর শরীরে ওষুধ প্রয়োগের পর নির্ধারিত অপেক্ষাকাল শেষ হওয়ার আগেই জবাই করা হলে মাংসে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

গবেষণার নেতৃত্ব দেন রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজের ভেটেরিনারি ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজি ও অ্যানেস্থেসিয়ার অধ্যাপক লুডোভিক পেলিগ্যান্ড।

গবেষণার অংশ হিসেবে ২০২১-২২ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে সংগ্রহ করা ৫৫৮টি মুরগির বুকের মাংসের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এসব নমুনা বিশ্লেষণ করা হয় সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে ৬৯ ধরনের ভেটেরিনারি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয় এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়।

নমুনার একটি অংশ সংগ্রহ করা হয় বাজার ও বিক্রয়কেন্দ্র থেকে, আর বাকি অংশ নেওয়া হয় বিক্রির উপযোগী ফার্মের মুরগি থেকে।

গবেষণায় দেখা যায়, বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা নমুনার ৩ দশমিক ৭ থেকে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, ২০২১-২২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে একই ধরনের পরীক্ষায় এই হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ০৫ থেকে শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ।

গবেষকদের ধারণা, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জবাইয়ের ঠিক আগ মুহূর্তেও অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে, যার কারণে মাংসে উচ্চমাত্রার অবশিষ্টাংশ পাওয়া যাচ্ছে।

অধ্যাপক লুডোভিক পেলিগ্যান্ড বলেন, “আশা করি, এ গবেষণার মাধ্যমে ভেটেরিনারিতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অবশিষ্টাংশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে এবং স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।”

ওয়ান হেলথ পোলট্রি হাবের মাধ্যমে গবেষণাটিতে অর্থায়ন করেছে ইউকে রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন গ্লোবাল চ্যালেঞ্জেস রিসার্চ ফান্ড।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ