
সোমবার (১৩ জুলাই) মুক্তি পাওয়া ছবিটির প্রথম ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকের মতে, এটি হতে পারে টম ক্রুজের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে সাহসী রূপান্তর।
অ্যাকশন নয়, এবার ব্যঙ্গাত্মক বাস্তবতা
‘ডিগার’ পরিচালনা করেছেন দুইবারের অস্কারজয়ী মেক্সিকান নির্মাতা আলেহান্দ্রো জি. ইনারিতু। ‘বার্ডম্যান’ ও ‘দ্য রেভেন্যান্ট’-এর মতো প্রশংসিত চলচ্চিত্রের পর এবার তিনি নির্মাণ করেছেন একটি ব্ল্যাক কমেডি, যেখানে হাস্যরসের আড়ালে উঠে এসেছে জলবায়ু সংকট, করপোরেট লোভ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠিন প্রশ্ন।
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ডিগার রকওয়েল—বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ধনকুবের। তার প্রতিষ্ঠানের একটি প্রকল্পের কারণে গ্রিনল্যান্ডের বিশাল হিমবাহ সরে যেতে শুরু করে। প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সামনে ব্যঙ্গ করে বলেন, কয়েক ফুট হিমবাহ সরে যাওয়ার কারণে বহু বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা বন্ধ করার কোনো কারণ নেই।
কিন্তু ছোট এই পরিবেশগত বিপর্যয় দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নেয়। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, এর প্রভাবে ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয় এমনকি পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তখন পৃথিবীকে রক্ষা করার চেয়ে নিজেকে মানবজাতির ত্রাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই হয়ে ওঠে ডিগারের প্রধান লক্ষ্য।
টম ক্রুজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় রূপান্তর?
‘ডিগার’-এর সবচেয়ে বড় চমক নিঃসন্দেহে টম ক্রুজ। প্রায় চার দশকের ক্যারিয়ারে তাকে এতটা ভিন্ন রূপে খুব কমই দেখা গেছে।
চরিত্রটির জন্য তিনি ব্যবহার করেছেন ভারী প্রস্থেটিক মেকআপ, বদলে ফেলেছেন হাঁটার ভঙ্গি, কণ্ঠস্বর, মুখের অভিব্যক্তি—এমনকি শরীরী ভাষাও। ট্রেলারে কখনো তাকে দেখা যায় অদ্ভুত রসবোধে ভরপুর, কখনো ক্ষমতার দম্ভে উন্মত্ত, আবার কখনো নাটকীয়ভাবে পৃথিবীকে রক্ষার ঘোষণা দিতে।
এই আত্মপ্রবঞ্চনাময়, হাস্যকর অথচ ভয়ংকর চরিত্রটি ইতোমধ্যেই দর্শকদের কৌতূহলের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
সাত বছরের অপেক্ষার ফল
পরিচালক ইনারিতু জানিয়েছেন, ‘ডিগার’-এর ভাবনা তার মাথায় আসে প্রায় এক দশক আগে। তিনি এমন একটি চলচ্চিত্র বানাতে চেয়েছিলেন, যেখানে ট্র্যাজেডি ও কৌতুক পাশাপাশি চলবে।
টম ক্রুজের সঙ্গে ছবির যাত্রাও শুরু হয় প্রায় সাত বছর আগে। প্রচলিত নিয়মে চিত্রনাট্য পাঠানোর বদলে ইনারিতু কয়েক দিন ধরে বসে পুরো গল্প নিজেই পড়ে শোনান।
পরে টম ক্রুজ জানান, সেই মুহূর্তেই তিনি বুঝেছিলেন—এই চরিত্র তাকে নিজের পরিচিত গণ্ডি থেকে বের করে আনবে। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এমন একজন নির্মাতার সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিলেন, যিনি তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে বাধ্য করবেন।
শক্তিশালী অভিনয়শিল্পীদের সমাবেশ
ছবিতে টম ক্রুজের সঙ্গে অভিনয় করেছেন—রিজ আহমেদ, সান্দ্রা হলার, জন গুডম্যান, জেসি প্লেমন্স, মাইকেল স্টুলবার্গ, সোফি ওয়াইল্ড এবং এমা ডি’আর্সি। এর মধ্যে জন গুডম্যান অভিনয় করেছেন অসুস্থ মার্কিন প্রেসিডেন্টের চরিত্রে, যিনি ডিগারের তৈরি করা সংকট থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করেন।
ভিজ্যুয়ালেও থাকছে ভিন্নতা
লেজেন্ডারি পিকচার্সের প্রযোজনায় নির্মিত ছবিটি পরিবেশন করছে ওয়ার্নার ব্রাদার্স পিকচার্স। যুক্তরাজ্যে প্রায় ছয় মাস ধরে শুটিং হয়েছে সিনেমাটির।
অস্কারজয়ী সিনেমাটোগ্রাফার ইমানুয়েল লুবেজকি ছবিটির চিত্রগ্রহণ করেছেন ভিস্তাভিশন ফরম্যাটে, যা বড় পর্দায় আরও সমৃদ্ধ ও সিনেম্যাটিক অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য পরিচিত।
শুধু সিনেমা নয়, সময়ের প্রতিচ্ছবি
‘ডিগার’ কেবল একজন বিলিয়নিয়ারের গল্প নয়। এটি এমন এক পৃথিবীর গল্প, যেখানে করপোরেট মুনাফা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত অহংকারের কাছে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে—সেই প্রশ্নই তুলেছে সিনেমাটি।
একই সঙ্গে এটি টম ক্রুজের অভিনয়জীবনেরও এক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দর্শকদের কাছে ছিলেন দুর্ধর্ষ অ্যাকশন হিরো। এবার তিনি এমন এক চরিত্রে অভিনয় করছেন, যাকে একই সঙ্গে ঘৃণা করা যায়, আবার চোখও সরিয়ে নেওয়া যায় না।
বিশ্বব্যাপী আগামী ২ অক্টোবর ২০২৬ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ‘ডিগার’। ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই অনেক চলচ্চিত্র বিশ্লেষকের ধারণা, এটি শুধু বছরের অন্যতম আলোচিত সিনেমাই নয়, টম ক্রুজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী অভিনয়গুলোর একটি হিসেবেও জায়গা করে নিতে পারে।


