
নয় মাস ধরে চলা বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিয়ষগুলো মাঠের লড়াইকে প্রভাবিত করেছিল বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে যেমন লড়াই করেছিল বাংলার জনগন তেমনি যুদ্ধ চলাকালীন এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল যা বাংলাদেশের বিজয়কে তরান্বিত করেছিল।
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ডামাডোলে যে উত্তেজনা সত্তরের নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল ২৫শে মার্চ বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে তা বাংলার মানুষের স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয়।
সেসময়ের বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় লাভ করে বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া এমনই আটটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরা হলো:
স্বাধীনতার ঘোষণা
ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসনামলে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরুঙ্কশ জয় লাভের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করেন। ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল হয়ে উঠে।
রেসকোর্স ময়দানে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভাষনের পর সমীকরণ বদলে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ পরিচালনা করে পাকিস্তানি সেনারা। এই অভিযানে পূর্ব পাকিস্তানের ৫০ হাজার নিরীহ বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয়। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসা থেকে আটক করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে।

২৭শে মার্চ সন্ধ্যায় কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করেন জিয়াউর রহমান। সেময় তিনি সেনাবাহিনীতে মেজর পদমর্যাদায় কর্মরত ছিলেন।
মুজিবনগর সরকার গঠন
২৫শে মার্চ পাকিস্তানী বাহিনী আক্রমনের পর আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ সিনিয়র নেতা ভারতে পালিয়ে চলে যান। এর নয়দিন পর ১৩ এপ্রিল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠক করেন তাজউদ্দীন আহমেদ।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল প্রথম গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল এই সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) শপথ গ্রহণ করেন। সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এসময় কলকাতায় উপ-হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন বাঙ্গালী কর্মকর্তা হোসেন আলী। প্রবাসী সরকার গঠনের পরপরই তাঁর নেতৃত্বে সেইসময় সেখানে কর্মরত প্রায় ৫০ জন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তিনি পাকিস্তানের উপ- দূতাবাসকে স্বাধীন বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনে রূপান্তরিত করেন। কলকাতার সেই কূটনৈতিক অফিসটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বিদেশে প্রথম অফিস।
মুক্তিবাহিনী ও সেক্টর গঠন
২৫শে মার্চ রাতেই সামরিক বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর বাঙ্গালি সদস্যরা বিদ্রোহ করে। সমস্ত অস্ত্র নিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় এবং মুজিব সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। এছাড়া সেসময় তরুন দেশপ্রমিকরা নিজেদের মতো করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল সামরিক বাহিনীর বাঙ্গালি কর্মকর্তারা সিলেটের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে এক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় এম এ জি ওসমানী যুদ্ধে নেতৃত্ব দিবেন এবং বাংলাদেশকে চারটি সামরিক অঞ্চলে ভাগ করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হবে। পরে এটি তেলিয়াপাড়া স্ট্র্যাটেজি হিসেবে পরিচিত হয়।

অস্থায়ী সরকার গঠনের পর তাজউদ্দীন আহমেদ আরও চারটি সামরিক অঞ্চল ঘোষণা করে সেগুলোর সেক্টর কমান্ডারদের নাম ঘোষণা করেন। কিন্তু পুরো বিষয়টি কাঠামো পায় ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে। ১২ থেকে ১৭ জুলাই কলকাতায় মুজিবনগর
সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত একটি দীর্ঘ বৈঠক হয়। সেখানেই তিনটি নিয়মিত বাহিনী তৈরি এবং বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। সুষ্ঠুভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার লক্ষে প্রতিটি সেক্টরকে অঞ্চলভেদে সাব-সেক্টরে ভাগ করা হয়।
অপারেশন জ্যাকপট
মুক্তিযুদ্ধ তরান্বিত করার অন্যতম বড় আরেকটি পদক্ষেপ ছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গঠিত নৌ-কমান্ডো বাহিনীর প্রথম অপারেশন ছিল এটি। ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম, মোংলা সমুদ্রবন্দর, চাঁদপুর এবং নারাণগঞ্জ নদী বন্দরে একযোগে একই নামে পরিচালিত হয় অপারেশনগুলো।

এটি অত্যন্ত সফল অপারেশন ছিল। কারণ একযোগে পাকিস্তান ও আরো কয়েকটি দেশ থেকে আসা অস্ত্র, খাদ্য এবং তেলবাহী ২৬টি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি অভিযানে অংশগ্রণকারী কোন গেরিলা শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়েনি।
আখাউড়া দখল
ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার বাড়িয়ার আখাউড়া ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সামরিক দিক থেকে মুক্তিবাহিনী, পাকিস্তান এবং ভারতের কাছে ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটে রেলপথে যেতে হলে পাকিস্তানী বাহিনীকে এই পথ দিয়েই যেতে হতো। হানাদারদের সেনা পরিবহন, মালামাল ও রসদ সরবরাহে বাঁধা সৃষ্টি করতে এটি দখল করা জরুরি ছিল।
১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আখাউড়া দখলের যুদ্ধ চলে। এই যুদ্ধেই ভারতীয় বাহিনী সর্বপ্রথম মুক্তিবাহিনীর সাথে অংশগ্রহণ করেছিল। তবে, ৩ ডিসেম্বর রাতে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে ৪ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনারা ট্যাংক নিয়ে আক্রমণ করে।
৫ ডিসেম্বর যৌথবাহিনী আখাউড়ার পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক দিয়ে হানাদার বাহিনীকে পুরোপুরি ঘিরে ফেলে। ফলে ৬ ডিসেম্বর যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পনে বাধ্য হয় পাকহানাদার বাহিনী।
ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধুর ভূমিকায় ছিল ভারত। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার পরিচালনা থেকে শুরু করে শরনার্থী আশ্রয়, মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ দেওয়াসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল দেশটি। একইসাথে বহির্বিশ্বের সমর্থন পেতে কাজ করে গেছে ভারত।
ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়েনর মধ্যে ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগীতার ঐতিহাসিক মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির কারণে পুরো বিশ্ব ভারতকে যে কোনঠাসা করে রাখতে চেয়েছিল সে জায়গা ঘুরে যায় বলে মেন করেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অধ্যাপক মুনতাসির মামুন। বলা যায় যে সোভিয়েত ইউনিয়েনর সমর্থনের কারণেই ভারত সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে সাহস করে।
জাতিসংঘের প্রস্তাব
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেয়া শরনার্থীদের জন্য জাতিসংঘ মানবিক সেবা দিলেও পাকিস্তানের আক্রমণ নিয়ে সক্রিয় কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে মনে করেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক মুনতাসির মামুন।
তবে, যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানের পরাজয় যখন অনেকটাই নিশ্চিত তখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্তেজনা দেখা দেয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এর আগে পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ বিরতি সংক্রান্ত ইস্যুটি আলোচনার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাঠিয়ে দেয়।
৮ ডিসেম্বর সাধারণ পরিষদে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবের উপর ভোটাভুটি হয়। তখন নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা জানিয়েছিল, প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছিল ১০৪টি আর বিপক্ষে ১১টি। তবে, ভারত এরই মধ্যে জানিয়ে দেয় যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব তারা মানবে না।
এরপর ১৪ ডিসেম্বর পোল্যান্ড একটি খসড়া প্রস্তাব দেয়। ১৫ ডিসেম্বর পোল্যান্ডের খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বসে নিরাপত্তা পরিষদ। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীকে ৭২ ঘন্টার মধ্যে আত্মসমর্পনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সাথে বাংলাদেশ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলা হয়।

ভারতের যুদ্ধে জড়ানো
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে জয় আর পাকিস্তানের পরাজয়ের সবশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ভারতের উপর পাকিস্তানের আক্রমন এবং সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারত পাকিস্তানে আক্রমনের পর যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে যায় ভারত।
ফলে প্রথম থেকে সতর্কতার সাথে বাংলাদেশকে সমর্থন ও সহায়তা দিয়ে আসলেও মুক্তিবাহিনীর সাথে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয় মিত্রবাহিনী।
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশটির পার্লামেন্টে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন। এতে যুদ্ধের প্রকৃতি বদলে যায়।

ভারতীয়রা যুদ্ধে জড়িয়ে যাবার কয়েকদিনের মধ্যেই যশোর, খুলনা, নোয়াখালী অতিদ্রুত মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। পাকিস্তানের পরাজয় তখন শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে মিত্রবাহিনী ঢাকার কাছে পৌঁছে যায়। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন ভূখন্ডের।
সূত্র: বিবিসি


