
বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন নাটকীয়তা খুব কমই দেখা যায়। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর হাঁটু গেড়ে বসে কান্নায় ভেঙে পড়লেন লিওনেল মেসি। চোখের জলেই যেন ধরা দিল স্বস্তি, লড়াই আর বেঁচে থাকার গল্প। প্রায় বিদায়ের মুখ থেকে ফিরে এসে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর ম্যাচে দীর্ঘ সময় পিছিয়ে থেকেও শেষ ১৩ মিনিটে তিন গোল করে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস গড়ে লিওনেল স্কালোনির দল।
শুরু থেকেই ম্যাচে ছিল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ। ১৫ মিনিটে ইয়াসের ইব্রাহিমের গোলে এগিয়ে যায় মিশর। প্রথমার্ধেই সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু মেসির নেওয়া পেনাল্টি দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। এরপর ৬৭ মিনিটে মোস্তফা জিকোর গোলে ব্যবধান ২-০ হলে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বিদায় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল।

কিন্তু এরপরই বদলে যায় পুরো ম্যাচের গল্প। ৭৯ মিনিটে মেসির ফ্রি-কিক থেকে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেডে ব্যবধান কমায় আর্জেন্টিনা। চার মিনিট পর দুর্দান্ত ফিনিশে সমতা ফেরান মেসি। আর নির্ধারিত সময়ের যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের ক্রস থেকে এনজো ফার্নান্দেজের হেডে আসে জয়সূচক গোল। মাত্র ১৩ মিনিটে তিন গোল করে বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে ফেলে আলবিসেলেস্তেরা।
তবে ম্যাচজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে রেফারিং নিয়ে। দ্বিতীয়ার্ধে মিশরের আরেকটি গোল ভিএআর পর্যালোচনার পর বাতিল করা হয়। শেষ দিকে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগের মুহূর্তেও মিশর পেনাল্টির দাবি তোলে, কিন্তু রেফারি খেলায় বাঁশি দেননি। ম্যাচ শেষে মিশরের কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়রা তীব্র প্রতিবাদ জানান। দেশটির ফুটবল ফেডারেশনও ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দিয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। ফিফা এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেছে, সব ম্যাচের রেফারিং সিদ্ধান্ত নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই জয়ে নতুন কয়েকটি রেকর্ডও গড়েছেন মেসি। মিশরের বিপক্ষে করা গোলটি ছিল বিশ্বকাপে তার ২১তম গোল, যা এই টুর্নামেন্টে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে চলতি বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে আটে। ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে গুইয়ের্মো স্তাবিলের পর এক আসরে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ গোলের কীর্তিতেও নাম লেখালেন তিনি। এছাড়া বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ছয়টি ভিন্ন আসরে অন্তত একটি করে অ্যাসিস্ট করার নজির গড়েছেন এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
আর্জেন্টিনার জন্য জয়টি আরেকটি পরিসংখ্যানও উজ্জ্বল করেছে। বিশ্বকাপে আফ্রিকান প্রতিপক্ষের বিপক্ষে টানা নবম ম্যাচে অপরাজিত থাকল তারা।
ম্যাচ শেষে সতীর্থদের কাঁধে উঠে উদযাপন করলেও আবেগ সামলাতে পারেননি মেসি। শেষ বাঁশি বাজতেই হাঁটু গেড়ে বসে শিশুর মতো কেঁদে ফেলেন তিনি। হয়তো এই কান্নায় ছিল বিদায়ের শঙ্কা থেকে ফিরে আসার স্বস্তি, বিশ্বকাপ স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার আনন্দ এবং আরেকটি মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হওয়ার অনুভূতি।


