
কাবুলের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন আর সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আর্টিলারি ফায়ার দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। এক সময়ের ‘কৌশলগত মিত্র’ পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান এখন সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত।
শুক্রবার তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে পাকিস্তান। এই সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন গজব লিল হক’। অভিযানের অংশ হিসেবে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানগুলো কাবুল, কান্দাহার এবং পতিয়া অঞ্চলে বোমাবর্ষণ করে।
‘গজব লিল–হক’ অভিযানে এ পর্যন্ত ২৭৪ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। শুক্রবার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র একথা জানান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
দুই পক্ষের সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ২৭ পাকিস্তানি আহত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ। তবে, তালেবান সরকার জানিয়েছে তাদের ৮ জন যোদ্ধা নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছে। উভয় পক্ষই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করলেও রয়টার্স স্বাধীনভাবে এসব তথ্য যাচাই করতে পারেনি।
পাকিস্তান-আফগানিস্তানের বর্তমান সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি। এটি পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত ও উপজাতীয় এলাকায় সক্রিয় ১৩টি ছোট-বড় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বয়ে তৈরি একটি ‘আমব্রেলা’ সংগঠন। টিটিপির মূল লক্ষ্য পাকিস্তানে কঠোর শরিয়া আইন জারি করা এবং পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থা ও সামরিক বাহিনীকে উচ্ছেদ করা।
তালেবান সরকার টিটিপিকে আফগানিস্তানে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে বলে বারবার অভিযোগ করে আসছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সামরিক বাহিনী।
এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, “আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশে হামলা চালানোর অনুমতি কাউকে দেওয়া হচ্ছে না। পাকিস্তান তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যর্থতা ঢাকতে আমাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।”
বর্তমান এই সংঘাতের গভীরতা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৮৯৩ সালে। ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব স্যার মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগান আমির আবদুর রহমান খানের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রেখা টানা হয়, যা ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত।
প্রখ্যাত আফগান ইতিহাসবিদ এবং নৃবিজ্ঞানী টমাস বারফিল্ড তার ‘আফগানিস্তান: অ্যা কালচারাল অ্যান্ড পলিটিকাল হিস্ট্রি’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ডুরান্ড লাইন পশতুন সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে বিভক্ত করেছে। আফগানরা কখনোই এই বিভাজনকে মন থেকে মেনে নেয়নি।
আফগানিস্তানের কোনো সরকারই ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। ইতিহাসবিদ বার্নেট আর রুবিন তার বই ‘দ্য ফ্র্যাগমেন্টেশন অব আফগানিস্তান’-এ দেখিয়েছেন, পশতুন জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে আফগান রাষ্ট্র সবসময় আপসহীন।
পাকিস্তান যখন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই সীমান্ত বরাবর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করে, তখন থেকেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে। আফগান তালেবানের মতে, এটি কেবল ভৌগোলিক বিভাজন নয়, বরং দুই পাড়ের পশতুনদের সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করার একটি পাকিস্তানি চক্রান্ত।


