
বাইডেন প্রশাসনের করা আইনের বিরুদ্ধে চীনা কোম্পানি টিকটকের করা আপিল খারিজ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট।
অর্থ্যাৎ, এখনই দ্রুত কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না হলে আগামী রোববার যুক্তরাষ্ট্রে বন্ধ হয়ে যাবে মার্কিনিদের প্রিয় এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
সুপ্রিম কোর্টের নয় বিচারকের প্যানেল শুক্রবার সর্বসম্মত রায়ে বলেছে, ডিজিটাল যুগে ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ এবং পর্যালোচনা করা অ্যাপ কোম্পানিগুলোর একটি সাধারণ চর্চা।
“কিন্তু টিকটক যে মাত্রায় তা করে এবং বিদেশি শত্রুদের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ থাকার যে ঝুঁকি তাতে জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে কোম্পানিটির ক্ষেত্রে সরকারের ভিন্ন আচরণকে ন্যায্যতা দেয়।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল ‘প্রটেকটিং আমেরিকানস ফ্রম ফরেন অ্যাডভারসারি কন্ট্রোলড অ্যাপলিকেশন অ্যাক্ট’ নামের একটি বিলে সই করলে যুক্তরাষ্ট্রে হুমকির মুখে পড়ে টিকটক।
ওই আইনে বলা হয়, চীনা মূল কোম্পানি বাইটড্যান্স টিকটকে তাদের অংশীদারত্ব ছয় মাসের মধ্যে কোনো আমেরিকান কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেবে, নয়ত যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা হবে অ্যাপটি।
টিকটক ওই আইন আটকাতে ৭ মে আদালতে যায়, তাদের আবেদনে বলা হয়, এ ধরনের আইন বাকস্বাধীনতার অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ এবং দেশটির সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এরপর ২ অগাস্ট যুক্তরাষ্ট্র সরকার টিকটকের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। সেখানে অভিযোগ করা হয়, চীনা এই সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি অবৈধভাবে শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করছে এবং অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলার চেষ্টা করলে তাতে সাড়া দিচ্ছে না।
৬ ডিসেম্বর ফেডারেল আপিল আদালত টিকটকের মামলা খারিজ করে দেয়। ফলে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারির মধ্যে বাইটড্যান্সের শেয়ার বিক্রি না করলে টিকটক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি জোরালো হয়।
তবে, দেশটির নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রায়ের পর বলেছেন, টিকটক নিষিদ্ধ হবে কি না সে সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন। আর সেজন্য তার অবশ্যই সময় পাওয়া উচিত।
এর মধ্যে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে টিকটক। টিকটক এবং কন্টেন্ট নির্মাতাদের আইনজীবীরা শুনানিতে বলেন, টিকটকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলে যুক্তরাষ্ট্রে এ প্ল্যাটফর্মের ১৭ কোটির বেশি ব্যবহারকারীর বাকস্বাধীনতা লঙ্ঘিত হবে।
কিন্তু, শুক্রবার দেওয়া রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বাইডেনের করা আইনকে সমর্থন দিলে যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায়।
আইনটি কার্যকর হওয়ার কথা ১৯ জানুয়ারি; অর্থাৎ ট্রাম্পের নতুন মেয়াদ শুরুর ঠিক আগের দিন।
বর্তমানে টিকটক নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান তার প্রথম মেয়াদের থেকে আলাদা। তিনি নিজেই ২০২০ সালে টিকটক নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। এমনকি, সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফটের টিকটক কিনে নেওয়ার বিষয়েও তিনি রাজি ছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প টিকটক নিয়ে তার মতামত বদলে ফেলন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের টিকটক ব্যবহারকারীরা এখন রেডনোট নামে আরেকটি চীনা অ্যাপের দিকে ঝুঁকেছেন। নিজেদের ‘টিকটক রিফিউজি’ বলে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যবহারকারীরা ব্যাপক পরিমাণে রেডনোট ডাউনলোড করছেন। আর তাতে অ্যাপলের মার্কিন অ্যাপ স্টোরে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া অ্যাপের তালিকায় চলে আসে রেডনোট।
চীন, তাইওয়ান এবং অন্যান্য ম্যান্ডারিন-ভাষী জনগোষ্ঠীর তরুণদের কাছে আগে থেকেই জনপ্রিয় রেডনোট টিকটকের প্রতিদ্বন্দ্বী। বলা যায়, রেডনোট হল টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মিশেলে। এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাসে প্রায় ৩০ কোটি।
কিন্তু, টিকটকের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। কারণ গুরুত্বপূর্ণ কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এভাবে বন্ধ করে দেওয়ার নজির নেই যুক্তরাষ্ট্রে। সরকার ঠিক কীভাবে আইন প্রয়োগ করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিবিসি লিখেছে, টিকটক স্রেফ সংযোগ বন্ধ করে দিতে পারে। অর্থাৎ,যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের টিকটক অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে নতুন কেউ আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই অ্যাপ ডাউনলোড করতে পারবেন না।
অবশ্য টিকটকের বন্ধ হওয়া ঠেকাতে পারে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।
প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, হোয়াইট হাইজের শেষ দিনে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছা তার প্রশাসনের নেই।
অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার যে আলোচনা হয়েছে, সেখানে টিকটকের প্রসঙ্গও ছিল।


